সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ভয়াবহতা দেখলো বাংলাদেশে। শাহবাগের অবরোধ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে যা একসময় রূপ নেয় কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচীতে। এরপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির সাক্ষী হয়ে দেশ আবার ফিরতে শুরু করেছে তার চিরচেনা রূপে। প্রায় সপ্তাহ পর আজ ২৪ জুলাই রাজধানীতে দেখা গেল যানজট, খুলেছে অফিস-আদালত, চালু হয়েছে ইন্টারনেট সেবা।
গত ১৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত, বিটিভি, সেতু ভবনে অগ্নিকাণ্ড, মেট্রোরেল স্টেশনে ভাঙচুর, কারফিউ জারি, সেনা মোতায়েনের মত ঘটনাও ঘটেছে। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হল।
১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার)
কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচী শুরু হয় এদিন। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। মহাখালীতে সেতু ভবন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভবন, দুর্যোগ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। শতাধিক গাড়ি পোড়ানো হয়। দুই দফা আগুন দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এতে অন্তত ১২ ঘণ্টা বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ ছিল। এদিন সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ১৮ জুলাই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপে বসার ইচ্ছার কথাও জানান।
রাজধানীর মহাখালীতে খাজা টাওয়ারের ডাটা সেন্টারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের অপটিক্যাল ফাইবারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে রাত থেকেই দেশজুড়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া, রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে জননিরাপত্তার স্বার্থের কথা উল্লেখ করে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় এদিন।
১৯ জুলাই (শুক্রবার)
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংসতা হয়।
সন্ধ্যায় ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে চলমান আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়। পরে ১৪ দলের নেতারা গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির পরামর্শ দেওয়া হয়।
এদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দুটি মেট্রোরেল স্টেশন, এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন নরসিংদীর জেলা কারাগারের গেট ভেঙে ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। লুট করা হয় অস্ত্র। পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের মধ্যে আনসরুল্লাহ বাংলা টিমের সাত সদস্য ও জেএমবি’র দুই নারী সদস্যও রয়েছে।
২০ জুলাই (শনিবার)
সরকারি সিদ্ধান্তে এ দিন দেশজুড়ে কারফিউ দেওয়া হয়। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় শুরু হওয়া কারফিউ এদিন দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত শিথিল ছিল। কারফিউ চলাকালে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সেনা মোতায়েন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে। এদিন ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আট দফা দাবি তুলে ধরেন কোটা আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক। একইসঙ্গে তারা জানান, আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
কারফিউ চলাকালেও এদিন ঢাকার যাত্রাবাড়ি, উত্তরা, বাড্ডা ও মিরপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। রাজধানীর বাইরেও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজীপাড়া ও মিরপুর ১০ স্টেশনে ভাঙচুর করা হয়।
২১ জুলাই (রোববার)
রোববার সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের রায়ে বলা হয়, কোটাপ্রথা হিসেবে মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ; মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। এই নির্দেশনার আলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগকে অনতিবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। রায়কে স্বাগত জানায় কোটা সংস্কারের দাবিতে নামা আন্দোলনকারীরা।
দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এদিন তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার সকালে গণভবনে এ বৈঠক হয়।
বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের চলমান পরিস্থিতির বিষয়ে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি দূতাবাস ও মিশনপ্রধানদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। কোটা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরসহ স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা দেশজুড়ে সহিংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বলে জানিয়েছেন তিনি।
২২ জুলাই (সোমবার)
কোটাপ্রথা সংস্কার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করা প্রজ্ঞাপন অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন বিকেল ৩ টার দিকে ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক সম্মেলন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক।
২৩ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
২৩ জুলাই (মঙ্গলবার)
কোটাপ্রথা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কোটা সংস্কারবিষয়ক প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে বিকেলে গুলশানে নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনে আহত হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার নেবে। এ ছাড়া তাদের নামে হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহার করে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে পুঁজি করে সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীসহ অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়।
রাতে ফিরতে শুরু করে ইন্টারনেট সেবা।








