অ্যাশেজ সিরিজ খেলতে প্রায় তিন মাসের সফরে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল ইংল্যান্ড। ছয় ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম দুটি হয়েছিল ড্র। তৃতীয় টেস্টে বৃষ্টির কারণে প্রথম চারদিন মাঠে বল গড়ায়নি একটিও। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে খেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এরমাঝে ঘটে যায় ক্রিকেটীয় বিপ্লব। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় ওয়ানডে ক্রিকেট। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি।
ইতিহাসটা আরেকটু বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুরুর কথা ছিল অ্যাশেজের তৃতীয় টেস্ট। কিন্তু বিধিবাম! বৃষ্টি যেন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ভূপৃষ্ঠে অবতরণ শুরু করেছিল, যেন খেলা না হয়। তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিবৃষ্টিতে আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় প্রথম দুদিন বল মাঠে গড়াবে না।
প্রবল বৃষ্টির কারণে তৃতীয় দিনেও পরিত্যক্ত হয়েছিল খেলা। তখন বোঝা গিয়েছিল মেলবোর্ন টেস্ট হতে চলেছে পরিত্যক্ত। মেলবোর্ন কর্তৃপক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ড আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীনের ঝুঁকিতে পড়ে যায়। পরিস্থিতি সামলাতে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড সমঝোতার ভিত্তিতে সিরিজে একটি অতিরিক্ত টেস্ট খেলতে রাজি হয়।
সিরিজে ম্যাচ সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং বিবাদে জড়িয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। ইংলিশ ক্রিকেটাররা যে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, এখনকার যুগে তা হাস্যকর মনে হতে পারে। সফরকারী দলের খেলোয়াড়রা যুক্তি দিয়েছিলেন, ধকল সামলে ৪০ দিনের ভেতর চারটি টেস্টে খেলানোর আশা করাটা ছিল অযৌক্তিক।
দর্শকদের ম্যাচ দেখা থেকে বঞ্চিত না রাখার জন্য স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা হিসেবে টেস্টের পঞ্চম দিনে ৪০ ওভারের একটি একদিনের ম্যাচ খেলার জন্য দুদল সম্মত হয়। খেলাটিকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনিচ্ছা থাকায় দলের নাম ইংল্যান্ড একাদশ এবং অস্ট্রেলিয়ান একাদশ রাখা হয়। শেষ মুহূর্তে একটি তামাক কোম্পানি ৫ হাজার পাউন্ডে ম্যাচটি স্পন্সর করে। ম্যাচসেরা খেলোয়াড়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ পাউন্ড।
ম্যাচটি নিয়ে গণমাধ্যমে সন্দেহ ছিল এবং কেউ কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ওয়ানডে ফরম্যাট জনপ্রিয় প্রমাণিত হবে না। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে না হয়ে মঙ্গলবার ম্যাচ পড়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। ওয়ানডের আগেরদিন মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে খাবার সরবরাহে নিয়োজিত কর্মীদের ২০ হাজার মানুষের খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দেয়া ছিল। বিস্ময়করভাবে সীমিত ওভারের খেলায় মাঠে উপস্থিত ছিল ৪৬,০০৬ জন দর্শক।
কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ম্যাচ শুরুর আগে খেলোয়াড়দের ডেকে নিয়ে একটি বেঞ্চে দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন। শেষে তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা ইতিহাস সৃষ্টি দেখছেন।’
প্রথম ওয়ানডেতে টস জিতে ফিল্ডিং নেয় অস্ট্রেলিয়া। গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি ছিলেন প্রথম বোলার। স্ট্রাইকিং প্রান্তে থেকে ওয়ানডের প্রথম বল মোকাবেলা করা ব্যাটার ছিলেন জেফরি বয়কট। অবসরের পর তিনি ধারাভাষ্যে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বয়কটের উইকেট নিয়ে একদিনের ক্রিকেটে প্রথম উইকেট শিকারি বোলার হন অ্যালান থম্পসন, ক্যাচ নিয়েছিলেন অজি অধিনায়ক বিল লরি।

ইংল্যান্ড ৩৯.৪ ওভারে ১৯০ রানে অলআউট হন। ওপেনার জন এডরিচ দেড়ঘণ্টা ক্রিজে থেকে ১১৯ বলে ৪টি চারে ৮২ রানের ইনিংস খেলে ওয়ানডেতে প্রথম ফিফটির মালিক হন। স্বাগতিকদের হয়ে অ্যাশলি ম্যালেট ও কেইথ স্টেকপোল নেন তিনটি করে উইকেট।
ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ৩ উইকেট পাওয়া অজি অফস্পিনার অ্যাশলে ম্যালেট স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, ‘এটাকে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক বলে অভিহিত করা হয়। আমাকে অনেক বছর পরে এসেও এটা অবাক করে। আমি ভেবেছিলাম, এটা ইতিহাসের অংশ। সেই খেলাটিকে আমরা একটু রসিকতা বলেই মনে করেছিলাম।’
অস্ট্রেলিয়া একাদশ ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ৪২ বল বাকি রেখে ৫ উইকেটে জিতে যায়। ৬০ রান করা ইয়ান চ্যাপেলকে সঙ্গ দিয়েছিলেন ডগ ওয়ালটার্স। ইংল্যান্ড অধিনায়ক রেমন্ড ইলিংওয়ার্থ ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। তবে ৮২ রানের ইনিংসের জন্য ম্যাচসেরা হন এডরিচ।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক রেমন্ড ইলিংওয়ার্থ ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়া নিয়ে কম ভাবছিলেন। মাঠে পা বাড়ানো নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৯৯৪ সালে বলেছিলেন, ‘সবাই ড্রেসিংরুমে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে খেলার জন্য আমরা অনেক কৃতজ্ঞ ছিলাম। এটা স্পষ্ট ছিল যে, ওয়ানডে বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে। তবে এখনকার মতো এতো তীব্রতার সঙ্গে চলবে ভেবেছিলাম এমনটা বলতে পারি না।’
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রগুলো দ্রুতই খেলাটির অপ্রতিরোধ্য সাফল্যকে স্বাগত জানায়। ইংল্যান্ডের ম্যানেজার ডেভিড ক্লার্ক বলেছিলেন, তিনি ১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলে একটি সংক্ষিপ্ত ওয়ানডে সিরিজের জন্য এক সপ্তাহ বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
১৯৭৫ সালে প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ হলেও এর প্রসার নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। মূলত ১৯৭৭ সালে ক্যারি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজই পরবর্তীতে ওয়ানডে ক্রিকেটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা সময়ের সাথে কেবল বেড়েই চলে।
কালের বিবর্তনে বর্তমানে টি-টুয়েন্টির আগ্রাসনে ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের সম্মুখীন। অনেকেই ধারণা করেন, ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ হবে টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টি। থাকবে না ওয়ানডের অস্তিত্ব। আদৌ হারিয়ে যাবে নাকি টেস্টের মতো ঠিকই টিকে যাবে তার উত্তর তোলা থাকল মহাকালের ঝুড়িতেই।








