সিলেট থেকে: রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) পরিচালক হিসেবে আসেন ফারুক আহমেদ ও নাজমুল আবেদীন ফাহিম। পরে নাজমুল হাসান পাপন সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের পর বোর্ড প্রধান পদে আসেন ফারুক আহমেদ। চার মাস না যেতেই ফারুক ও নাজমুল আবেদীনের দ্বন্দ্বে জড়ানোর খবর এসেছে গণমাধ্যমে। বিসিবি সভাপতি একদিন আগে বলেছেন, নাজমুল আবেদীনের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এদিকে দ্বন্দ্বে জড়ানোকেই ‘লজ্জাজনক’ বললেন বিসিবির সাবেক পরিচালক ও বিপিএলে ঢাকা ক্যাপিটালস কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন।
সোমবার সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের আউটারে ঢাকা ক্যাপিটালসের অনুশীলন শেষে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেন খালেদ মাহমুদ। ফারুক আহমেদ ও নাজমুল আবেদীনের বিষয়ে কথা বলেন। খালেদের মতে, ফারুক ও নাজমুল দুজনই জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার এবং দুজনই সিনিয়র। তাদের মধ্যে অহমিকা থাকার বিষয়টি আক্ষেপজনক। বলেছেন, ‘একটা ঘটনা দেখলাম ফারুক ভাই-ফাহিম ভাইয়ের দ্বন্দ্ব, যে দুজনই সাবেক ক্রিকেটার তাদের কেন ইগোর সমস্যা হবে। তারা তো ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্যই আসছেন।’
বিসিবির দায়িত্ব নেয়ার পর ফারুক আহমেদ ও নাজমুল আবেদীন অনেককিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিফলন না দেখায় হতাশ খালেদ মাহমুদ। দুই পরিচালকের দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে ‘লোভ-লালসা’র কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
‘তারা যখন আসছেন, তখন তো অনেক কমিটমেন্ট দেখছিলাম। বিশেষ করে ফাহিম ভাই তো বলছিলেন, উনি অনেক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছেন, দেখছেন। চিন্তা করছেন। সেগুলো এখন দেখতেছি না। এখন দেখতেছি লোভ-লালসার মতো হয়ে যাচ্ছে, যে আমি অপারেশনস না পাইলে কাজ করব না, পদত্যাগ করব। এটা তো লোভ-লালসা। আমার মনে হয় কেন এই লোভ-লালসা তাদের মধ্যে আসে। আমার ক্রিকেট অপারেশনস নিতে হবে কেন? যদি অন্য কমিটির চেয়ারম্যান হই, সেখানে সার্ভ করতে পারব না কেন? আমার কেন থাকতেই হবে, যে না আমি পাবো।’
‘উনি কি ক্রিকেট অপারেশনসের মাস্টার? ওনার আগে তো আকরাম ভাই ক্রিকেট অপারেশনসের মাস্টার। উনি চাইতে পারেন। কারণ আকরাম ভাই বাংলাদেশের সাবেক ক্যাপ্টেন এবং অপারেশনসের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাহলে উনি কেন বলতেছেন অপারেশনস ছাড়া হবেই না। এটা তো ইগোর ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। ফারুক ভাই-ফাহিম ভাই, আমার মনে হয় ইগোর প্রব্লেম। সত্যি কথা বলতেছি, এটা কী হচ্ছে আই ডোন্ট নো।’
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেকেই বিসিবি পরিচালকের পদ ছেড়েছেন। নির্ধারিত পদের বিপরীতে অনেক কম সংখ্যক পরিচালক নিয়ে বোর্ড পরিচালনা করতে হচ্ছে ফারুক আহমেদকে। ওয়ার্কিং কমিটিও হয়নি। সেটাকে অবশ্য বিসিবি সভাপতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন খালেদ মাহমুদ। পাশাপাশি নতুন পরিচালক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, ‘এতো অল্প ডিরেক্টর দিয়ে ফারুক ভাইয়ের জন্য বোর্ড চালানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেটা কেন? ফারুক ভাই নতুন ডিরেক্টরদেরকে নিচ্ছেন না, যাদেরকে ওনারা নিতে চান, তাদেরকে নিয়ে নিলেই পারেন।’
সাবেক দুই ক্রিকেটারের দ্বন্দ্বের বিষয়টি খালেদ মাহমুদ নিজেদের জন্য লজ্জাজনক হিসেবে দেখছেন। বলেছেন, ‘যখন তাদের এই মনোভাব দেখি, তখন খারাপ লাগে। দুইজন সিনিয়র মানুষ আমরা যাদেরকে অনেক রেসপেক্ট করি, ফারুক ভাই ও ফাহিম ভাই, দুজনেই আমাদের রেসপেক্টেড মানুষ এবং ক্রিকেটার। তাদেরকে যখন এমন দেখি, ক্রিকেটার হিসেবে লজ্জিত হই, আসলে আমরা কী ক্রিকেটাররা এতবেশি লোভী নাকি?’
বোর্ড কর্তাদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসা পছন্দ হয়নি খালেদ মাহমুদের। তার মতে এটা বাইরে না এনে নিজেরাই সমাধান করতে পারতেন। বললেন, ‘জিনিসটা হচ্ছে যে সংসারে অশান্তি আছেই। কার সংসারে অশান্তি নাই, সবার সংসারেই আছে। তাই বলে এটা পাবলিক হবে নাকি? আমার কথা হল, ফাহিম ভাই-ফারুক ভাই দুজনই অনেক সিনিয়র মানুষ। ফাহিম ভাই তো অবশ্যই, আমাদের সবার গুরু। আমাদের ক্রিকেট প্রশিক্ষক, অনেক বছর। উনি এতো বিচক্ষণ মানুষ, উনি এটা পাবলিক করবেন কেন? উনি যদি মনে করেন, ওনার সম্মান পাচ্ছেন না, উনি সরাসরি ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবেন এবং উনি ফারুক ভাইকে বলবেন এটা যদি না হয় আমি…! উনি বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের মেম্বার সেক্রেটারি। সরাসরি পদ থেকে পদত্যাগ করবেন।’
‘আমার কথাটা যে, যে জিনিসটা চার দেয়ালের মাঝে শেষ হতে পারত, সেটা সারা বাংলাদেশের মানুষ জানবে। তারা দুজনই ক্রিকেটার। আমাদের ক্রিকেটারদের মানুষ কী ভাববে, আসলে তো আমরা, আমাদের তো নিজেদের স্বার্থের জন্য বোর্ডে যাই তাহলে। এই কথাটা ভাবা তো খুবই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সব ক্রিকেটারের জন্য তো এটা খুব লজ্জাজনক ব্যাপার।’
‘দুজনই সিনিয়র মানুষ যেটা করলেন, আমাদের দেশে যত ক্রিকেটার আছে ন্যাশন্যাল টিমে বা বাইরে- এটা খুবই লজ্জাজনক। তাদের এই ইগো প্রব্লেম বা তাদের এই কাড়াকাড়ি প্রব্লেম চলতেছে যে কে বোর্ড প্রেসিডেন্ট হবে, কে অপারেশনস হবেন, আর কে ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান হবেন। ইটস ভেরি ফানি, লজ্জাজনক আমাদের জন্য।’
এর আগে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন বোর্ড পরিচালক নাজমুল আবেদীন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সঙ্গে আলাপে নিজেই বিষয়টি সামনে আনেন। ঘটনার জেরে নাজমুল আবেদীন বোর্ডের দায়িত্ব ছাড়তে চাচ্ছেন, এমন খবরও আসে।
বোর্ড সভাপতি ঠিক কী বলেছিলেন সেটি প্রকাশ না করলেও বর্ষীয়ান কোচ ও ক্রিকেট সংগঠক ফাহিম বলেছিলেন, ‘আমি জানি না কেনো প্রেসিডেন্ট আমার ব্যাপারে কমেন্ট করেছে। তবে আমি খুব অবাকও হয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমি মোটেই আশা করিনি ওরকম একটা মন্তব্য। আর সেটা অনেকগুলো মানুষের সামনে। সেখানে মন্ত্রণালয়ের মানুষ ছিল। পরিচালকদের যে জায়গা দেয়া দরকার, সেটি কতটা বিসিবি প্রেসিডেন্ট দিতে চান, তা স্পষ্ট নয়। আমার কথা কিছুটা ভিন্ন হতে পারত। কারণ, আমরা দুজনই নতুন এসেছি। সেখানে আমাদের মধ্যে একসাথে কাজ করার যে ব্যাপারটা, সেখানে এ ধরনের মন্তব্য সমীচীন নয়।’
তখন বোর্ড থেকে সরে যাওয়ার কথাও বলেন নাজমুল আবেদীন, ‘আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় বোর্ডে না থাকলেই বুঝি ভালো হয়। কারণ বোর্ডের বাইরে থেকে আমি যে ভূমিকা রাখতে পারি বা কথা বলতে পারি, তা বোর্ডে থেকে সম্ভব না। আমি যদি বোর্ডে থাকি, আমাকে কাজ করতে হবে। যদি কাজ করতে না পারি, তার চেয়ে ভালো বাইরে থাকা।’
যদিও পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে রাজী হননি নাজমুল আবেদীন। পরে বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদ জানান ইতিমধ্যেই বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। বলেন, ‘ফাহিম ভাই আমার বয়োজ্যেষ্ঠ, সিনিয়র মানুষ। আমারও সিনিয়র প্লেয়ার। আমার অনেক সিনিয়র। সেদিক বিবেচনা করে উনি হয়ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন। ফাহিম ভাই আর কোনো কথা বলতে চাননি। আমার পাশেই ছিলেন। মোট কথা আমরা সমস্যার সমাধান করেছি।’








