আমীরুল ইসলাম
টেলিভিশনের সমান বয়স আমাদের। টেলিভিশনের রুচির সঙ্গে, আইডিয়ার সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠেছি, বড় হয়েছি, সঙ্গেও আছি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিভিন্ন সময়ে কত ধরনের অনুষ্ঠান যে হয়েছে, তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। আর যেসব অনুষ্ঠান আমাদের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে তার হিসাবও অনেক বড়।
যদি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের কথাই বলি তবে মনে পড়ে যায়– হেদায়েত হোসাইন মোরশেদের সজনে বিজনে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘সপ্তবর্ণা’, ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’, আনিসুল হকের ‘অন্তরালে’, শফিক রেহমানের ‘লাল গোলাপ’, রেজাউর রহমানের ‘আইন আদালত’, হানিফ সংকেত-এর ‘ইত্যাদি’, আবদুন নূর তুষারের ‘শুভেচ্ছা’– এ রকম অনেক অনুষ্ঠানের কথা স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে এক ধরনের একটা ফরম্যাট থাকে। নাচ, গান, কৌতুক, কুইজ, কমেডি, রিপোর্টিং নানাকিছু মিলিয়ে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান তৈরি হয়। সেই ধারা এখনও চলছে। কিন্তু এই ফরম্যাট ভেঙে অন্য ধরনের একটি ম্যাগাজিন হতে পারে সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন শাইখ সিরাজ। এমনিতেই কৃষি ও কৃষক একটি নীরস বিষয়।
কিন্তু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ এই নীরস বিষয়টিকে সজীব করে তুলেছেন তাঁর সহজসরল এবং সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে।
গত প্রায় দুই দশক ধরে চ্যানেল আইতে কৃষকের ঈদ আনন্দ তাঁর একটি উদাহরণ। শাইখ সিরাজ কৃষি ও কৃষক নিয়ে অনুষ্ঠানের জ্বলন্ত নির্মাতা। তিনি আজীবন কৃষকের সঙ্গে থেকেছেন। কৃষকের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা অনুভব করেন হৃদয় দিয়ে। নিজেকে উৎসর্গ করেছেন কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে। দুটো ঈদে তিনি দুটো অনুষ্ঠান করে থাকেন। এই অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’।
এটা যেন একটি উৎসব। ঈদ এলে আমরা নাটক, সিনেমা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অপেক্ষায় থাকি ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানের জন্য। দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ মনে করে এই অনুষ্ঠানটি তাদের একান্ত নিজস্ব।
তারা উপস্থিত থেকে অংশ নিচ্ছে, অনুষ্ঠান দেখছে, প্রাণভরে হাসছে, হাততালি দিচ্ছে। যেন পুরো দেশটা এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ রকম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান বিটিভির ইতিহাসে কিংবা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগে আমরা দেখিনি। এই অনুষ্ঠানটি গণমানুষের অনুষ্ঠান। এখানে যেমন সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা আছে, তেমনি শহরে বনেদি পরিবারের মানুষ উপভোগ করছে, এটাই এই অনুষ্ঠানের সার্থকতা।
হৃদয়ে মাটি ও মানুষ করতে করতে এ রকম একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন শাইখ সিরাজ। এই অনুষ্ঠানটি প্রথম থেকেই সাড়া ফেলেছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে দর্শকদের মাঝে, এ কথা অকপটে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। এই অনুষ্ঠানে একেবারে গ্রামীণ খেলাধুলা থাকে।
যেমন বালিশ লড়াই, কাবাডি, স্বামীর চোখ বাঁধা অবস্থায় বউকে সাজানো বা চিনে নেওয়া, মোরগ লড়াই, তৈলাক্ত কলাগাছে উঠাসহ নানা ধরনের খেলাধুলা যেগুলো আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। অন্যান্য অনুষ্ঠান যেগুলো বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে সেগুলোর কথা শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ রাখছি। কৃষকের ঈদ আনন্দ প্রচারের আগে একসময়ে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা যেমন, হা-ডু-ডু, নৌকাবাইচ, কানামাছি, ঘোড় দৌড়, লাঠিখেলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল।
শাইখ সিরাজ আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকে ফিরিয়ে এনেছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন গ্রামে গ্রামে তৈরি হয়েছে শাইখ সিরাজ। এসব ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনেই তৈরি করছে নানারকম কনটেন্ট।
শাইখ সিরাজকে অনুকরণ করে গ্রামীণ খেলাধুলাকে তারা তুলে ধরছে। কৃষকের ঈদ আনন্দ থেকে উৎসাহিত হয়ে তারা এই কাজটি করছে আনন্দচিত্তে। এই ব্যাপারে শাইখ সিরাজ নিজেও গর্ববোধ করেন, আনন্দ পান তরুণ ছেলেমেয়েকে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে দেখে।
সবকিছু বিচার করে বলতেই পারি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের ইতিহাসে ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অন্যতম একটি অনুষ্ঠান হিসেবে ইতিহাস হয়েই থাকবে।








