যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো জোটে ধরে রাখার বিষয়ে ক্রমেই আশাবাদ হারাচ্ছে ইউরোপের মিত্রদেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা, জোটের ভেতরে নতুন করে বিভাজন তৈরি করেছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি তার অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমে কিছু ইউরোপীয় দেশ সহযোগিতা না করায় তিনি ক্ষুব্ধ।
এমনকি গত ২০ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এসব দেশকে ‘ভীরু’ বলেও আখ্যা দেন। সম্প্রতি দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। যদিও ১ এপ্রিল দেওয়া এক ভাষণে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি, তবুও তার আগের মন্তব্যগুলো ইউরোপে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই অবস্থানকে আরও জোরালো করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি ন্যাটোকে ‘একমুখী’ জোট হিসেবে উল্লেখ করে সংঘাত শেষে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুবিওর এই অবস্থান ইউরোপের রাজধানীগুলোতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিদায়ের প্রস্তুতির আবহ তৈরি করেছে।
তবে অতীতে রুবিও ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন। ২০২৩ সালে সিনেটর হিসেবে তিনি এমন একটি আইনের পক্ষে কাজ করেছিলেন, যা প্রেসিডেন্টকে একতরফাভাবে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখে। ওই আইনে বলা হয়, সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে না।
এদিকে ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইভো ডালডার পরিস্থিতিকে জোটের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ সময়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ট্রাম্পকে ধরে রাখার চেষ্টার বদলে ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।
ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও এক নয়। পেদ্রো সানচেজ-এর নেতৃত্বাধীন স্পেন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর নতুন লক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইরানে হামলার ক্ষেত্রে তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারে মার্কিন বাহিনীকে বাধা দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স তুলনামূলক সংযত ভূমিকা পালন করছে।
তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ড্রোন প্রতিরোধে সহায়তা করেছে এবং সাইপ্রাসের নিরাপত্তায় নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে। তবে ট্রাম্প ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়েও সন্তুষ্ট নন। যুক্তরাজ্য শুরুতে মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিলেও পরে সীমিতভাবে অনুমতি দেয়।
তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।” জবাবে ট্রাম্প তার নেতৃত্বের তুলনা উইনস্টন চার্চিল-এর সঙ্গে করে সমালোচনা করেন। এছাড়া ইতালিও কিছু মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য সিসিলির ঘাঁটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে মতবিরোধ ন্যাটোর ঐক্যকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জোটের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।







