ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। আর বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম ভোট হয় ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে। সেই থেকে ১০০ বছরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৩৭ বার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৪ বছরে নির্বাচন হয়েছে মাত্র সাতবার।
সবশেষ ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন আগামীকাল ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এদিন সকাল ৮টা থেকে বিভিন্ন হলের বাইরে নির্ধারিত আটটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ইতোমধ্যেই ভোটগ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।
গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎসহ উদ্দীপনা দেখা দেয়। এরপর গত ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের তফসিল ঘোষণা করে। ৭ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় শেষ হয় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। প্রচারের শেষ মুহূর্তে নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে ব্যস্ত সময় পার করেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও সমর্থকরা। আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে গণসংযোগ, মিছিল এবং লিফলেট বিতরণসহ সব জায়গাতেই নিজেদের কমিটমেন্টের কথা বলেছেন প্রার্থীরা। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য প্রায় ১১ মাসের প্রস্তুতির পর এবার ঐতিহাসিক এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৯ সেপ্টেম্বর।
এই নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনীতি, গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। নির্বাচনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আলাদা আলাদা প্যানেলে অংশ নিচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীও হয়েছেন অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ব্যবস্থায় তরুণদের অনেকেই দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। যে কারণে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের মানুষের মধ্যেও নানা আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
ডাকসু ভোটের তফসিল অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ডাকসুর ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৭১ জন প্রার্থী। একই সঙ্গে ১৮টি হলে ২৩৪টি পদের জন্য লড়ছেন ১ হাজার ৩৫ জন প্রার্থী। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মোট ৪১টি ভোট দিতে হবে। ডাকসুর ব্যালট হবে পাঁচ পৃষ্ঠার, আর হল সংসদের ব্যালট হবে এক পৃষ্ঠার। ভোট গ্রহণ হবে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান শিক্ষার্থীদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন তোমরা গভীরভাবে প্রত্যাশা করেছ। এটি গণ-অভ্যুত্থানের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য সমন্বিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠস্বর তৈরি করাই এই নির্বাচনের লক্ষ্য।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানিয়েছেন, নির্বাচনের দিন সকাল থেকে ২,০৯৬ জন পুলিশ ক্যাম্পাসজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
সোমবার বিকালে টিএসসিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে তিনি বলেছিলেন, বর্তমানে নিরাপত্তায় রয়েছেন ১,৭৭১ জন পুলিশ সদস্য। নির্বাচনকালীন এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে দুই হাজারেরও বেশি। তাদের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও দায়িত্ব পালন করবে।
অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে কোনো নিরাপত্তা-শঙ্কা নেই। শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে ভোটদানের সুযোগ দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার প্রাথমিক দায়িত্বে থাকবেন বিএনসিসি, রোভার ও রেঞ্জাররা। লাইন ম্যানেজমেন্টে সহায়তা করবেন প্রক্টরিয়াল বডি ও শিক্ষকরা। পুলিশও থাকবে, তবে তাদেরকে ক্যাম্পাসের ভেতরে নয়, বাইরে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ভোটগ্রহণের সময় কেন্দ্রে ব্যাগ, মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, পানির বোতল ও তরল পদার্থ আনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবেন এবং নির্বাচিত নেতারা ছাত্রসমাজের অধিকার রক্ষায় কাজ করবেন।







