ভাষাকে বলা হয় নদীর মতো বহমান। নদী যেমন পথ চলতে গিয়ে একেক জায়গায় একেক নামে পরিচিত হয়, তেমনি স্থানভেদে ভাষার সুর, উচ্চারণ ও শব্দচয়নেও ভিন্নতা দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যই ভাষার সৌন্দর্য। তবে ভাষা ও শব্দের ব্যবহার কখনো কখনো রাজনৈতিক ভাবেও জড়িয়ে পড়ে। এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগে ঠিক তেমনই এক বিতর্ক সামনে এসেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ও ৫ আগস্টের পর থেকে গত এক–দেড় বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তির বক্তব্যে বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে কিছু আরবি ও উর্দু শব্দ- ইনসাফ, আজাদি, ইনকিলাব, গোলামি, বয়ান, জুলুম- ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমন নয় যে এসব শব্দ অপরিচিত। তবে অনেকের আপত্তি তখনই, যখন যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত বাংলা প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ভিনদেশি শব্দ সামনে আনার চেষ্টা করা হয়।
স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় বিভিন্ন ভাষার প্রভাব রয়েছে। ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, পর্তুগিজসহ নানা ভাষার বহু শব্দ দৈনন্দিন জীবনে মিশে গেছে। যেমন ‘চেয়ার’ শব্দটি এতটাই পরিচিত যে অনেকেই এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘কেদারা’ ভুলে গেছেন। কিন্তু ‘ন্যায়বিচার’-এর বদলে ‘ইনসাফ’ বা ‘স্বাধীনতা’-র পরিবর্তে ‘আজাদি’ ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
তবে এই সমালোচনার বিপরীতে ভিন্ন মত দিয়েছেন গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সুমন রহমান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘একুশ মানে ভাষাপুলিশিং নয়।’
তিনি বলেন, একাত্তরে স্বাধীনতার ডাক নতুন ছিল বলেই মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি তখন মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘ন্যায়বিচার’ শব্দটি স্বৈরশাসকদের হাতিয়ার হয়ে পড়ে। ফলে স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন হয় ‘ইনকিলাব’ আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দরকার হয় ‘ইনসাফ’-এর।
তার মতে, নতুন শব্দভান্ডার মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল লড়াইও হয়েছে ভাষার ময়দানে। সেই লড়াইয়ে পরাজিত শক্তিরাই এখন ভাষাপুলিশের ভূমিকায় হাজির হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইনকিলাব বা ইনসাফ ব্যুৎপত্তিগতভাবে বাংলা নয়, বিদেশি শব্দ। তবে বাংলার অধিকাংশ শব্দই বিভিন্ন ভাষা থেকে এসেছে। সমৃদ্ধ ভাষার এটিই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম-ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইনসাফ একটি সুন্দর বাংলা শব্দ। ইনকিলাবও তাই। তেমনি ফয়সালা, আজাদি, জিন্দাবাদ, আওয়ামী ও লীগও। এমনকি চু… লিংপং-ও!’
বিপরীত চিন্তাও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তানভির আশিক নামে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেছেন: যারা ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদী’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে চান, তারা এইসব শব্দ ব্যবহার করবেন। এতে পৃথকীকরণটা সহজ হবে। গুপ্তদের বোঝা যাবে। ‘মুক্তিযুদ্ধের বছর’কে কেউ কেউ ‘গণ্ডগোলের বছর’ বলেন। আমার বাবা বলেছিলেন, যারা ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে ‘গণ্ডগোল’ বলে তারা আসলে পরাজিত শক্তি, যে কোন উপায়েই ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে খাটো করতে পারলে, একটু ম্লান করতে পারলে ওদের ভালো লাগে।
আলফি সলোমন নামে আরেক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেছেন: ভাষার মাস ফেব্রুয়ারী চলছে। ভুলে গেছেন?
ভুলে যাননি, আপনাকে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে! আজকের পর কেউ যদি আপনার সামনে ইনকিলাব, ইনসাফ, আজাদী, সিলসিলা ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার করে তাহলে মুখের উপর বলবেন “চুপ থাক, রাজাকার, বাংলায় কথা ক, নাইলে দূরে গিয়া মর”।
তিনি আরও লেখেন: একটা ভাষার মধ্যে অন্য নানা ভাষার শব্দ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই নর্মাল। এবং এই প্রক্রিয়া এক দুই বছরের না। বহু বছর একটা শব্দ এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করার পর আস্তে আস্তে আপনার লেক্সিকনে ঢুকবে। তারপর আস্তে আস্তে ভাষার একটা পার্ট হবে। কিন্তু আপনার বুঝতে হবে এই দীর্ঘ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে হঠাৎ কোনো একটা শব্দ আপনার চারপাশে প্রচুর ঘরঘুর করা মানে এখানে উদ্দেশ্য খারাপ। ওই শব্দটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আসেনি বরং বাংলা ভাষাকে অন্য ভাষা দিয়ে রিপ্লেস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভাষা নিয়ে এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে অনেকে মনে করছেন, মাতৃভাষা দিবসের মূল চেতনা হলো মাথা উঁচু করে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করা- ভাষার ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ নয়।








