ঢাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী আনিস রহমান। প্রতি বছর ঈদের আগে তড়িঘড়ি করে নিউমার্কেট নয়তো বঙ্গমার্কেট থেকে পরিবারের জন্য কাপড়, জুতো আর কসমেটিকস কিনে গ্রামে যেতেন ঈদ করতে। তার দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, ‘মানসম্মত এবং আধুনিক নকশার জিনিস কেবল ঢাকাতেই পাওয়া যায়’। অন্যদিকে, গার্মেন্টস কর্মী ইয়াসমিন সারামাস হাড়ভাঙা খাটুনি আর ওভারটাইম করে জমানো টাকা দিয়ে গত বছরও সাভার বাজারের ভ্যান ও ছাপড়া মার্কেট থেকে ছোট ভাই আর মা-বাবার জন্য কাপড় কিনেছিলেন। আনিস ও ইয়াসমিনের মতো লাখো মানুষের এই অভ্যাসের কারণে ঈদের কেনাকাটার সিংহভাগ টাকা এতদিন বড় শহরগুলোতেই আটকা পড়ে থাকত।
তবে এবারের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার ঈদে টানা সাত দিনের লম্বা ছুটি ঘোষণা করায় আনিস এবং ইয়াসমিন দুজনেই রমজানের বেশ আগেই নাড়ির টানে গ্রামে পৌঁছে গেছেন। আনিস তার নিজ জেলা শহরের শোরুম থেকে কেনাকাটা করছেন পরিবারের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে, এছাড়া সে পাড়ার মোড়ে বসে পুরনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। ইয়াসমিনও তার মাকে নিয়ে স্থানীয় মফস্বল বাজারে গিয়ে সময় নিয়ে পছন্দমতো শাড়ি কিনছেন।
এই যে সরকারির পলিসি ও ব্যক্তির ছোট ছোট সিদ্ধান্তের পরিবর্তন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এক বিশাল রূপান্তরের গল্প।
ছুটির ব্যাপ্তি ও যাতায়াতের স্বস্তি
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ঈদের ছুটির ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত তিন দিনের সরকারি ছুটিই ছিল দীর্ঘদিনের নিয়ম। তবে গত এক দশকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এই ছুটির ব্যাপ্তি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। কখনও নির্বাহী আদেশে একদিন বাড়তি ছুটি যোগ করা হয়েছে, আবার কখনও সাপ্তাহিক ছুটির সাথে মিলিয়ে তা চার থেকে পাঁচ দিনে ঠেকেছে। কিন্তু এবারের সাত দিনের দীর্ঘ বিরতি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
এই বর্ধিত ছুটির ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের পরিবহন ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর। যখন ছুটি মাত্র তিন দিনের থাকে, তখন দেশের কয়েক কোটি মানুষ একসাথে রাজধানী ছাড়ে, যার ফলে মহাসড়কগুলোতে অবর্ণনীয় যানজট এবং নৌ ও রেলপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। কিন্তু এবার ছুটি আগেভাগে শুরু হওয়ায় যাত্রীদের চাপ নির্দিষ্ট একটি দিনের ওপর না পড়ে বরং কয়েক দিনের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। এতে মানুষ যেমন ভোগান্তিহীনভাবে বাড়ি ফিরতে পারছে (যদিও কিছু রুটে সমস্যা রয়েছে), তেমনি আগেভাগে গ্রামে পৌঁছানোর ফলে স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও মানসিক প্রশান্তি পাচ্ছে। এই শান্তিময় যাতায়াত ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যয়ের মানসিকতাকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
যদিও দীর্ঘদিন কলকারখানা বন্ধ থাকা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের নানা উৎকণ্ঠাও রয়েছে।
শহরকেন্দ্রিক কেনাকাটার প্রথা ভাঙা
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির বিভিন্ন সময়ের তথ্য ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা মতে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১,৫০,০০০ কোটি থেকে ১,৭০,০০০ কোটি টাকার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রবাহ যখন কেবল বড় শহর কেন্দ্রিক থাকে, তখন গ্রামীণ অর্থনীতি এক ধরনের স্থবিরতার শিকার হয়। তবে এবার লম্বা ছুটির কারণে মানুষ যখন আগেভাগে গ্রামে যাচ্ছে, তখন তাদের খরচের কেন্দ্রবিন্দুও পরিবর্তিত হচ্ছে।
ঢাকা থেকে কেনাকাটা করে ভারী ব্যাগ বহন করার ঝুঁকি ও খরচ এড়াতে মানুষ এখন স্থানীয় বাজারের ওপরই আস্থা রাখছে। এর একটি বড় কারণ হলো গত কয়েক বছরে মফস্বল শহরগুলোতেও মানসম্মত ব্র্যান্ডের শোরুম গড়ে ওঠা। এখন আর ভালো ব্র্যান্ডের জুতো বা পোশাকের জন্য জেলা থেকে ঢাকায় আসার প্রয়োজন পড়ে না। বরং মফস্বলের দোকানগুলোতে আধুনিক রুচির সমন্বয় ঘটায় স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি নিজ এলাকাতেই খরচ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
অর্থনীতির ভাষায় কী বলে?
এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনটিকে মূলত ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা গুণক প্রভাব বলা হয়ে থাকে। আনিস যখন ঢাকা থেকে একটি পোশাক কিনতেন, তখন সেই লভ্যাংশ বড় কর্পোরেট বা ঢাকার ব্যবসায়ীর কাছেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন যখন তিনি তার জেলা শহরের দোকান থেকে কিনছেন, তখন সেই টাকাটা স্থানীয় দোকানের কর্মচারী, স্থানীয় দর্জি এবং ক্ষুদ্র সরবরাহকারীদের হাতে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১ টাকা যখন স্থানীয় বাজারে খরচ হয়, তা হাতবদল হয়ে ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে কয়েক গুণ বেশি প্রভাব ফেলে।
পাশাপাশি ‘সার্কুলার ফ্লো অব ইনকাম’ বা আয়ের চক্রাকার প্রবাহের তত্ত্বে দেখা যায়, ইয়াসমিনের মতো হাজারো কর্মী যখন গ্রামে গিয়ে খরচ করছেন, তখন শহরের অর্জিত অর্থ সরাসরি গ্রামীণ বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে গ্রামীণ ছোট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূলধন বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করছে। এর ফলে ‘শহরের টাকা গ্রামে যাচ্ছে’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।

সামাজিক বন্ধন ও আত্মিক টান বাড়ছে
অর্থনীতির কঠিন হিসাবের বাইরেও গ্রামে ও মফস্ফল শহরে একটি গভীর মানবিক দিক বা হিউম্যান অ্যাঙ্গেল রয়েছে। লম্বা ছুটির কারণে আনিসের মতো মানুষেরা যখন গ্রামে আগেভাগে পৌঁছান, তখন স্থানীয় বাজারে তার পুরনো স্কুল বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়া বা ইফতার আড্ডায় বসার সুযোগ তৈরি হয়। এই সামাজিক যোগাযোগগুলো মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজি তৈরি করে, যা আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল।
ইয়াসমিন যখন তার গ্রামের চেনা দোকানদারের কাছ থেকে হাসিমুখে আলাপ করে কেনাকাটা করেন, তার শহুরে পেশা নিয়ে নানা তথ্য দেন তখন সেখানে কেবল পণ্য কেনা হয় না বরং এক ধরনের সামাজিক সম্প্রীতি ও আস্থার সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়। এই আত্মিক টান মানুষের মধ্যে স্থানীয় উন্নয়নের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ববোধও তৈরি করে। তারা মনে করেন নিজের এলাকার দোকান থেকে কিনলে এলাকারই উন্নতি হবে।
আগামীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ঈদের আগে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও নগদ টাকার লেনদেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আগে এই টাকার প্রবাহ গ্রাম থেকে শহরের দিকে রিভার্স মাইগ্রেশন করত পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে। কিন্তু এবারের লম্বা ছুটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। মফস্বলের দর্জিবাড়ি থেকে শুরু করে ছোট ছোট বিউটি পার্লার কিংবা খাবার দোকান সব কিছুই এখন ঈদের উৎসবে চাঙা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আনিস ও ইয়াসমিনদের মতো বহু মানুষকে গ্রামে ফিরে কিছু করার স্বপ্নও দেখাচ্ছে।
আনিস আর ইয়াসমিনের মতো লাখো মানুষের এই শহরে আয় ও গ্রামে ব্যয় করার প্রবণতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে। সাত দিনের এই লম্বা ছুটি তাই কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো নয়, বরং এটি গ্রামীণ জনপদকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কগুলোকে আবার জোড়া দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








