দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকটে চাপে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দ্বিগুণেরও বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের আশঙ্কা, এই বেতন বৃদ্ধি বাজারে পণ্যমূল্য আরও বাড়াবে, আয় বৈষম্য তীব্র করবে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে বেসরকারি খাত এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকাকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এমন বাস্তবতায় সরকারি খাতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি হলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর মধ্যেই জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন ৮ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এই কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, এই বিপুল অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে। বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় অংশই পরিচালন ব্যয়ে ব্যয় হচ্ছে এবং উন্নয়ন ব্যয় অনেকটাই ঋণনির্ভর। অর্থনীতিবিদদের মতে, নিয়মিত বেতন-ভাতা ও পেনশনের মতো ব্যয় ঋণ করে মেটানো টেকসই নয় এবং এতে রাজস্ব ও ঋণের চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের নেই। তার মতে, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হলে তার চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। একই সঙ্গে সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অতীতেও বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর যুক্তি দেওয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল খুব একটা পাওয়া যায়নি। বরং কর ও শুল্ক বাড়ালে ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে এর প্রভাব পড়বে, যা সমাজে আয় বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তার মতে, বাজার কাঠামোয় স্বচ্ছতা আনা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও, বেসরকারি খাতের সংকট, রাজস্ব ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এটি অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা ও সামাজিক বৈষম্য বাড়াবে কি না-সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।








