অতিরিক্ত কফি পান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এমন ধারণা বহুদিনের। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিমিত মাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণ করলে উল্টো উপকারও হতে পারে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রখ্যাত মেডিকেল জার্নাল জেএএমএ-তে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ২–৩ কাপ ক্যাফেইনযুক্ত কফি পান করলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ফলে কফিপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে সুখবর।
ক্যাফেইন ও ডিমেনশিয়ার সম্পর্ক
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ৪৩ বছর ধরে ১ লাখ ৩১ হাজার ৮২১ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, যারা নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় ক্যাফেইনযুক্ত কফি পান করেন যা দিনে ২–৩ কাপ কফি বা ১–২ কাপ চায়ের সমান তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে। তবে এই সুবিধা ডিক্যাফ কফির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়, যারা টানা অন্তত এক দশক এই মাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম ছিল। এমনকি যাদের আলঝেইমার বা অন্যান্য ডিমেনশিয়ার জেনেটিক ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ক কার্যকর দেখা গেছে। যদিও গবেষণায় ডিমেনশিয়ার ধরন আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
ক্যাফেইন গ্রহণের সঠিক মাত্রা কত?
এই গবেষণায় অংশ নেন দুইটি বড় গবেষণা প্রকল্পের অংশগ্রহণকারীরা, নার্সদের স্বাস্থ্য অধ্যয়ন-এর নারী ও স্বাস্থ্য পেশাদারদের ফলো-আপ স্টাডি-এর পুরুষরা। গবেষণার শুরুতে তাদের বয়স ছিল মূলত ৪০-এর মাঝামাঝি বা ৫০-এর শুরুর দিকে। তাদের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা নিয়ে নিয়মিত জরিপ করা হয়।
এই সময়ের মধ্যে ১১ হাজার ৩৩ জন অংশগ্রহণকারী ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হন, যা চিকিৎসকের নির্ণয় বা মৃত্যুসনদ থেকে নিশ্চিত করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা দিনে ১–৫ কাপ ক্যাফেইনযুক্ত কফি পান করতেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি অন্তত ২০ শতাংশ কম। আর যারা প্রতিদিন অন্তত ১ কাপ কফি পান করতেন, তাদের ঝুঁকি কমে ১৫ শতাংশ।
তবে দিনে ২–আড়াই কাপের বেশি কফি পান করলে অতিরিক্ত কোনো উপকার পাওয়া যায় না। অর্থাৎ বেশি ক্যাফেইন মানেই বেশি উপকার এমন নয়।
বিশেষজ্ঞের মত
ম্যাস জেনারেল ব্রিঘামের নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ বিশেষজ্ঞ ও এপিডেমিওলজিস্ট ডা. ড্যানিয়েল ওয়াং নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, মানুষের শরীর সম্ভবত কফি ও চায়ে থাকা অতিরিক্ত বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না বলেই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পর উপকার স্থির হয়ে যায়।
তবে তিনি এটাও নিশ্চিত করেন যে বেশি ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রতিদিন তিন কাপ কফি ও গ্রিন টি পান করেন বলেও জানান।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
অনেক মানুষ ‘সাবজেকটিভ ডিমেনশিয়া’ অনুভব করেন যেখানে মনে হয় স্মৃতিশক্তি দুর্বল হচ্ছে। এটি জ্ঞানীয় অবনতির প্রাথমিক লক্ষণ। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি কফি পান করেন, তারা এ ধরনের সমস্যা কম অনুভব করেন।
আরও জানা যায়, ৭০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ১৭ হাজার নারীর ওপর নিয়মিত স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যারা নিয়মিত কফি পান করেন, তাদের মানসিক সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কফি জ্ঞানীয় অবনতিকে প্রায় সাত মাস পর্যন্ত ধীর করতে পারে।
এছাড়া, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয় দিনে ১–৩ কাপ চা বা কফি পান করলে হৃদযন্ত্রের ব্যর্থতা ও অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের ঝুঁকি কমে এবং করোনারি স্টেন্ট বসানোর পর রক্তনালি আবার সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনাও হ্রাস পায়।
তবে এই গবেষণায় কোন দেশের কফি বা কোন ধরনের কফি আমেরিকানো, লাতে, ম্যাচা বা ক্যাপুচিনো সবচেয়ে উপকারী, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।








