বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। দিন দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ সংখ্যা যদিও গত বছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত অনেক কম। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে গত বছর মারা গেছেন ৩০ জন রোহিঙ্গা। এ বছর মারা গেছেন ৩ জন।
গত বছরের জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯৩৭৯ জন। এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১৫৪৮ জন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে ক্যাম্পগুলোতে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বসতি। এই মৌসুমে বৃষ্টিপাত শুরুর সাথে সাথে ক্যাম্পগুলোতে চোখ রাঙ্গাতে শুরু করে ডেঙ্গু। শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী রয়েছে উখিয়ার তিন নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।
এ ক্যাম্পের বাসিন্দা মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে আশা রোহিঙ্গা হাফেজ আব্দুর রহমান বলেন, তার পরিবারের তিন সদস্য ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ক্যাম্পের হাসপাতালে ভর্তি আছেন। প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে তারা হাসপাতালে ভর্তি হন।
৪ নাম্বার ক্যাম্পের বাসিন্দা মাওলানা দলিলুর রহমান বলেন, মেয়ের জ্বর হওয়ার পর ভালো হচ্ছে না দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। বর্তমানে তার মেয়ে ক্যাম্পের ভেতরে থাকা ফিল্ম হাসপাতলে চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
উখিয়ার রাজা পালং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পাশাপাশি স্থানীয়দের মাঝে যাতে এই ডেঙ্গু ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পুরো এলাকায় নানাভাবে সচেতনতা কার্যক্রম চলছে।
কক্সবাজার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডাক্তার ফয়সাল জানান, গতবছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার পর ঢাকা থেকে একদল গবেষক আসেন এখানে। গবেষক দলটি তিন নাম্বার ক্যাম্পে একটি বড় পরিত্যক্ত জলাশয়ে বেশ কিছু লাভা পান। এই জলাশয় থেকে মূলত তিন নাম্বার ক্যাম্পে গত বছর ও এই বছর ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে বলে গবেষক দলটি জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে কাজ করেন শরণার্থী প্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডাক্তার আবু তোহা। তিনি বলেন, উখিয়ার, ৩.৪. ১ ডাব্লিও ১৭ নাম্বার ক্যাম্পে ডেঙ্গু রোগী দেখা যাচ্ছে। তবে আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে তাদেরকে নানাভাবে সচেতন করছি।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডাক্তার বিপাশ খিসা বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রোহিঙ্গাদের সচেতন করার জন্য।
কক্সবাজার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডাক্তার ফয়সাল জানান, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭৩টি হেলথ পোস্ট, ৪৫টি প্রাথমিক হেলথ সেন্টার ও ৮ টি পিল্ড হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালগুলোতে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, গত বছর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ক্যাম্পে নানা সচেতনতামূলক সভা, নানা প্রকার লিফলেট দেওয়ার পাশাপাশি বার্মিজ ভাষায় মাইকিং করা হয়। ক্যাম্পের সেকেন্ডারি হেল্পগুলোতে মশারিসহ আলাদা ডেঙ্গু বেড নিশ্চিত করা হয়। শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি নানা সংস্থা ডেঙ্গু প্রতিরোধের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গু আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে প্রাণ রক্ষার জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এসব রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক কারণে উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেন।







