রাজধানীর বসুন্ধরায় ডিসিএস অর্গানাইজেশনের অজ্ঞতা ও ভুল কীটনাশক প্রয়োগে দুই শিশুর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে পেস্ট কন্ট্রোল বা কীটনাশকের ব্যবসা করত তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, ডিসিএস অর্গানাইজেশনের পেস্ট কন্ট্রোলের কোন লাইসেন্স ছিল না। অনভিজ্ঞতার কারণে বাসা বাড়ির কীটনাশকের জায়গার তারা গুদামে সংরক্ষণ করার কীটনাশক প্রয়োগ করেছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার (বালাইনাশক ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: প্রতিষ্ঠানটি বাসাতে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ব্যবহার করেছিল যা কিনা গুদামে ব্যবহারযোগ্য। এটা এক প্রকারের অজ্ঞতা। গুদামের পেস্টিসাইড কখনোই বাসা বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য নয়। অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড খাদ্যগুদামে পোকামাকড় নিধনে এবং আমদানি রপ্তানির পণ্যে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, যেহেতু গুদামের মারাত্মক পেস্টিসাইড বাসায় ব্যবহার করা হয়েছিল, সেখানে ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টা বন্ধ রাখা দরকার ছিল। এরপর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ঘরে বাতাস ঢুকতে ও বের হতে দিতে হতো। এসব প্রক্রিয়া শেষে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পরই কেবল তা ব্যবহারযোগ্য হবে। পেস্টিসাইডে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এ বিষয়গুলো অনুসরণ করা হয়নি। কিংবা ওই প্রতিষ্ঠানটি পরিবারটিকে কোন বিধি নিষেধ দেয়নি।
ডিসিএস অর্গানাইজেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের পর মারা যাওয়া দুই শিশু সন্তানের বাবা মোবারক হোসেনও ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদকে বলেছিলেন, “আমার দুই সন্তান হারানোর পর জানতে পেরেছি, এই মেডিসিনটা বাসাবাড়ির জন্য নয়। অথচ লিখিত চুক্তি হয়েছে তাদের সঙ্গে; সেখানে এই বিষয়ে কিছুই ছিল না।”
ঠিকাদারি লাইসেন্সের আড়ালে বালাইনাশক বিক্রি
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (লালবাগ বিভাগ) উপ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: তেলাপোকা মারার বিষক্রিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় লালবাগ গোয়েন্দা বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরহাদুল আমিন ও চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে টাঙ্গাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বালাইনাশক বিক্রির জন্য তাদের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কোন লাইসেন্স ছিল না। মূলত তারা ঠিকাদারির লাইসেন্সে এই বালাইনাশক বিক্রি করত।
তারা এই বালাইনাশকগুলো আমদানি করত চীন থেকে। বাসা, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কীটপতঙ্গ সমূলে উৎপাটন করা হয়- এরকম গ্যারান্টি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচার করত প্রতিষ্ঠানটি। অনলাইনে তাদের কাছে কাজের অর্ডার আসত। এরপর তাদের কর্মচারীরা অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড দিয়ে পোকামাকড় নিধন করত।
ডিবি জানিয়েছে, ডিসিএস অর্গানাইজেশনের পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস সাধারণত এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য গড়ে ১৫ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা নিত।
দুঃখজনক মৃত্যুর পর সকল উদ্যোগ
এতদিন সবার চোখের সামনে অবৈধ ব্যবসা চললেও বসুন্ধরায় দুই শিশু এবং চট্টগ্রামে দুই বোনের মৃত্যুর পর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক হয়েছে।
বসুন্ধরা ট্র্যাজেডির পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা বালাইনাশক প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠনসহ নানা উদ্যোগ নেয়। উপপরিচালক রফিকুল আলম খানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাসাবাড়িতে বিভিন্ন পোকা দমনে উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের অনুমোদিত বালাইনাশক রয়েছে। অনুমোদিত বালাইনাশক ও পেস্ট কন্ট্রোল অপারেটরদের তালিকাও ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়িতে কৃষিকাজে ব্যবহার করা বালাইনাশক ব্যবহারের সুযোগ নেই।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণাও চালাচ্ছে তারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার (বালাইনাশক ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বলেন: সম্প্রতি সময়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের দেশে যে ১১৮টি পেস্টিসাইড প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের মালিক ও কর্মচারিদের নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। সেখানে আমরা তাদের শেখাবো কোন কীটনাশক কোন জায়গায় ছিটাবেন। দক্ষতার সঙ্গে ওষুধ দেওয়া, এর মাত্রা সম্পর্কে জানা, কোন ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, কী পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে, প্রভাব কতক্ষণ থাকবে এবং এরপর কীভাবে বাড়ি পরিষ্কার করা হবে; এসবই জানানো হবে।
‘এছাড়াও তাদের কাছে গত দুই বছরের আমরা একটি তালিকা চেয়েছি যেখানে স্পষ্ট হবে তারা কোথায় কোথায় কী কী কাজ করেছে। ইতোমধ্যে আমাদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস পরিচালনাকারীরা সেগুলো জমা দিচ্ছে,’ বলে জানান তিনি।
কর্মকর্তারা জানান, বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, ফসলের মাঠ ও শস্যের আড়ত বা খাদ্যগুদামে পেস্টিসাইড (বালাইনাশক) করার জন্য ১১৮টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা। এই লাইসেন্স পেতে হলে বেশ কিছু শর্ত পালন করতে হয়। শর্তগুলো পূরণ করতে না পারায় অন্তত আট শতাধিক আবেদনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

লাইসেন্সের নিয়ম সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার (বালাইনাশক প্রশাসন) উপপরিচালক ড. রফিকুল আলম খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মূলত আমরা আট রকমের লাইসেন্স দিয়ে থাকি। এর মধ্যে অন্যতম পেস্টিসাইড (বালাইনাশক) লাইসেন্স। শুরুতে প্রতিষ্ঠানে প্যাডে আমাদের কাছে আবেদন করতে হবে। আমাদের একটা ফর্ম পূরণ করতে হবে।এরপর আমরা ওই প্রতিষ্ঠানে দেখতে যাবো। তার দক্ষ জনবল আছে কি না? পাশাপাশি কিছু প্রশ্নোত্তর জানার জন্য সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা নিয়ে থাকি। যেমন তেলাপোকা দমনে কোন কীটনাশক আপনি প্রয়োগ করবেন কিংবা উইপোকা দমনে কোন কীটনাশক? প্রত্যেকটার জন্য আলাদা আলাদা অনুমোদিত পেস্টিসাইড রয়েছে। এই পরীক্ষায় উন্নীত হবার পর প্রতিষ্ঠানটির একটি গুদাম ঘর ও অফিস থাকতে হবে। এরসাথে ইনকাম ট্যাক্স, ফায়ার লাইসেন্স, টিআইএন, এনআইডি, সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনাপত্তিপত্র, দক্ষ জনবলের শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি কাগজ থাকতে হবে।
কিন্তু আসলে নজরদারি কতটা হয়? জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বলেন: ঢাকাতে একটু জটিল অবস্থা। এছাড়া আমাদের প্রত্যেকটা উপজেলা অফিসে বিসিএস কৃষি ক্যাডার রয়েছেন। তারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োজিত। আমাদের উপজেলাতেও কীটনাশক পরিদর্শক রয়েছেন। তারা দেখভাল করছেন। গ্রামে তারা কার্যকরী ভূমিকা পালন করছেন।
বালাইনাশক নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন: ভবিষ্যতে আমাদের যে নিজস্ব কর্মী বাহিনী রয়েছে তাদের দিয়ে একটি কমিটি করা হবে। সারা দেশের পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস পরিচালনাকারীরা কেমন কাজ করছে সেটা কমিটি দেখভাল করবে।








