বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেছেন: সংস্কৃতি স্রেফ একটি বিনোদনের বিষয় নয়; সংস্কৃতি হলো মানুষ যে জীবনযাপন করে, যে জীবন উপভোগ করে, যে জীবনসংগ্রাম করে, সংস্কৃতি সেই জীবনটাকে উদযাপন করে। দেশের কৃষ্টি, সাংস্কৃতিক জীবনবোধ, ঐতিহ্যকে ধারণ করে জীবনটাকে উদযাপন করতে হবে। আমরা সেই লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি একাধারে একজন নাট্যভিনেতা, নাট্যনির্দেশক, সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি লিয়াকত আলী লাকী। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন, উনসত্তর গণঅভ্যুত্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একজন অদম্য সাহসী তরুণ হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। সেই উত্তাল, বিক্ষুব্ধ অস্থির সময়গুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পরও একজন উদ্যমী মেধাবী সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে রাজপথে, মাঠে-ময়দানে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। রণাঙ্গনের যোদ্ধা হিসেবে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। একই সময়ে সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিলেন।
১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার সক্রিয় পদচারণা শুরু হয়েছিল। হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে স্কুলের সংসদে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে ব্যাপকভাবে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি একটি সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। অভিনীত নাটকের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। প্রচুর বিদেশি নাটক অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন। তার লেখা নাটককের সংখ্যা ১০টি। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় সঙ্গীতের সুরকার।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রথম ক্যাসেট ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা’ প্রকাশ করেছিলেন। উক্ত ক্যাসেটে দু’টি গান রচনা ও ৭টি গানে সুরারোপসহ সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। ১৯৭৮ সালে ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংস্কৃতি সভা’ গঠন ও এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৩ এর মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সকল গণ-আন্দোলনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। ঐ সময়ে মৌলবাদ বিরোধী নাটক ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ও ‘নির্মুল’ মঞ্চায়ন, স্বৈরাচার বিরোধী, মৌলবাদ বিরোধী পথনাটক, গণসঙ্গীত ও আবৃত্তি চর্চায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা পরিষদের সাংস্কৃতিক টিমের অন্যতম সদস্য হিসেবে বিভিন্ন তারকা শিল্পীদের নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। ১৯৮১ সাল থেকে লোক নাট্যদল গঠন করে পরবর্তীকালে এর ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে সমুন্নত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পরিষদের যাত্রা পালাগান ও গণসঙ্গীত’ এর উপ পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত নাটক ‘নির্মাণ’ ও ‘মহাপ্রয়াণ’ ‘বাংলার মুখ’ ও ‘মুজিব মানে মুক্তি’ পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস ‘বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাস’ এর পরিকল্পনা, রচনা, ও নির্দেশনা প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সুবর্ণ জয়ন্তীতে দলের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসভিত্তিক কাব্য গীতি নৃত্যনাট্য, সুবর্ণ জয়ন্তীর সূচনা সঙ্গীতের রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন।
১৯৫৭ সালে তার জন্ম। ঢাকার নবাবগঞ্জে তার গ্রামের বাড়ি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রন্থাগার বিজ্ঞান বিষয়ে ডিপ্লোমা লাভ করেছেন। একজন শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পী তিনি। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে ৫ বছরের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছেন। জাপান দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত এক বছরের জাপানি ভাষা শিক্ষা কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। দেশে ও বিদেশে আয়োজিত থিয়েটার বিষয়ক অসংখ্য উৎসব, সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, ওয়াকশপে অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে অনেকগুলো তিনি পরিচালনাও করেছেন।
লিয়াকত আলী লাকী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মতো এতো দীর্ঘসময় ধরে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন অনেকদিন যাবত। তিনি পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশনে প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী জেনারেল।

লিয়াকত আলী লাকী বাংলাদেশে আধুনিক মঞ্চ নাটক প্রসারে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে অন্যতম অগ্রণী ভ‚মিকা পালনকারী নাট্য সংগঠন লোক নাট্য দলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধিকতার দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে তিনি এর সহ সভাপতি।
নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংগঠন আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির সদস্য। ইন্টারন্যাশনাল অ্যামেচার থিয়েটার এসোসিয়েশন এর এশিয়ান রিজিওনাল কমিটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়্যুথ স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। পৃথিবীর প্রায় ৪০টি দেশে অনুষ্ঠিত এই সেমিনার ও কর্মশালায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব, সম্মেলন, সেমিনারে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশের জন্য অনেক সুনাম ও গৌরব বয়ে এনেছেন।
লিয়াকত আলী লাকী বাংলাদেশ নব শিশু নাট্য আন্দোলনের প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৬২টি শিশু নাট্যদল সংগঠিত হয়ে নিয়মিতভাবে নাট্যচর্চা করে আসছে। তিনি ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শতাধিক শিল্পী নিয়ে ব্যাপক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। এখানে নবপর্যায়ে আবৃত্তি, পথ নাটক ও গণসঙ্গীত প্রসারে অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন র্যাগ ডের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালিত হয়। যা সবার দারুণ প্রশংসা অর্জন করেছে। র্যাগ ডের বদলে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের অন্যতম প্রবক্তা ও সংগঠক ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী। বাংলাদেশে নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে নবজাগরণ সৃষ্টির অনন্য রূপকার তিনি। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের তিনবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা রেখে ব্যাপক আলোচিত এবং প্রশংসিত হয়েছেন।
বাংলাদেশের নাটক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রসারিত করার কাজটি সুচারুভাবে পালন করেছেন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাকে সামনের সারিতে দেখা গেছে সবসময়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। লিয়াকত আলী লাকী নির্দেশিত নাটক ‘কঞ্জুস’ বাংলাদেশের সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক। ইতোমধ্যে নাটকটির ৭৩১তম মঞ্চায়ন সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৮৭ সাল থেকে নিয়মিত এ নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে। দেশব্যাপী নাট্যোন্দোলনের প্রসার এবং বাংলা নাটককে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি টানা সাতবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তার আগে কেউ এই পদে এতো দীর্ঘসময় ধরে আসীন থাকেননি।
২০১০ সাল থেকে তিনি একটানা ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টির প্রেক্ষিতে লিয়াকত আলী লাকী বলেন, সমালোচক আমাদের চেয়ে বেশি বেশি জানবেন নিশ্চয়ই । আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যে কাজ করেছি তা বাংলাদেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিরল বলা যায়। কাজ করলেই সমালোচনা হবে। নানা কথা হবেই। কিছু না করলে সমালোচনা হবেনা এটা সর্বজনীন সত্যি কথা।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের একটি কথা এ প্রসঙ্গে বলতে চাই আমি। তিনি বলেছেন, ‘আমি এ পর্যন্ত নতুন কিছু করতে পুরনো অনেক কিছু ভেঙেছি, আবার গড়েছি। এ কাজ করতে গিয়ে আমাকে নানা সমালোচনা ও বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাতে আমি পিছিয়ে যাইনি। নতুন কিছু সৃষ্টির পথেই এগিয়ে গেছি।’
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে আজকের পর্যায়ে আনতে তিনি অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন। নিজের দায়িত্ব পালনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের শিল্প সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সীমাবদ্ধ থেকে বেরিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে জেলা পর্যায়, আবার সেখান থেকে বর্তমানে উপজেলা পর্যায়েও শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে করে দেশব্যাপী সুস্থ মননশীল চিন্তাধারার চর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিয়মিত চর্চা করার শক্তিশালী প্ল্যার্টফরম সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৃণমূলে সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে জোরালোভাবে রুখে দাঁড়ানোর উদ্দীপনা এবং জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। আগামি প্রজন্মকে যথার্থ বাঙালি সংস্কৃতির আলোকে বিকশিত করতে শিল্পকলা একাডেমী নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে।
ইতোপূর্বে শিল্পকলা একাডেমি কার্যক্রমের মধ্যে ছিল নাটক, চলচ্চিত্র নাচ, গান। ফটোগ্রাফি, আবৃত্তি চর্চার মতো বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে সংযুক্ত হয়েছে। এরপর আরও যুক্ত হয়েছে শিশু, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, লোকসংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদি বিষয়। তাছাড়া কম্পিউটার, আইটি সেক্টর তো রয়েছেই। আমরা জেলা থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমির আওতায় এতসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নিয়মিত অর্থায়ন করছি।
দেশের সংস্কৃতি চর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন শাখায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে লিয়াকত আলী লাকী একুশে পদক লাভ করেছেন গত ২০১৯ সালে। তার লেখা অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা ও গানের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গণহত্যার বধ্যভূমির ঘটনাধারা নিয়ে প্রকাশিত মূল্যবান প্রবন্ধ সংকলন সম্পাদনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের যাত্রা শিল্প, পুতুল নাট্যের ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারার নবজাগরণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সবগুলো প্রকাশনাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে। ছোটদের জন্য তার লেখা বেশ অনেকগুলো নাটক দর্শক-সমালোচক কর্তৃক উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছে। এছাড়া তার সুদক্ষ সম্পাদনায় কবিতাগ্রন্থ ‘শত কবিতায় বঙ্গবন্ধু’, গীত সংকলন ‘শত গানে বঙ্গবন্ধু’ প্রকাশিত হয়েছে।
বলাবাহুল্য, এ প্রকাশনাগুলোও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। তার সম্পাদনায় শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংকলনের মধ্যে রয়েছে ‘মানবতার জননী শেখ হাসিনা : নিবেদিত পঙক্তিমালা’, ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ : দেশপ্রেমের কবিতা’, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘মুক্তির মহানায়ক’ প্রভৃতি।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে লিয়াকত আলী লাকী অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি । শ্রেষ্ঠ শিশু সংগঠক হিসেবে ভারতের কলকাতা থেকে সমলয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাংলার মুখ সংগঠন কর্তৃক প্রদত্ত দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (বাংলাদেশ) হিসেবে বাংলার মুখ পুরস্কার লাভ করেছেন ।
২০০৪ সালে জাপানের তাইয়ামা’র গভর্ণর কর্তৃক প্রদত্ত সম্মাননা ‘অনরারি কালচারাল এনভয় অব জাপান’ গ্রহণ করেন। তিনি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ইউনিক গ্রুপ স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশত সংগঠন কর্তৃক ‘শিশুবন্ধু’ ও ‘শ্রেষ্ঠ শিশু সংগঠক’ পদক লাভ করেছেন। তিনি মুনীর চৌধুরী পদক এবং কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী সম্মাননা লাভ করেছেন। শিল্পকলা (অভিনয়) ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক একুশ পদক লাভ করেছেন ২০১৯ সালে। সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ এ বাংলা একাডেমি কর্তৃক সম্মানসূচক ফেলোশিপ লাভ করেছেন।
সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তার দক্ষ বিচক্ষণ নেতৃত্বে গতি লাভ করেছে। আজ দেশজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিগত করোনা মহামারীর মধ্যেও এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড স্থবির ছিল না। তখন তার সুযোগ্য নেতৃত্বে ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে।
আর্ট এগেইসস্ট করোনা কার্যক্রমটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশ্বের কোথাও এমন কার্যক্রম দেখা যায়নি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি করোনা মহামারীর সময় এর কার্যক্রম বন্ধ রাখেনি। নানাভাবে দেশব্যাপী নানা অনুষ্ঠান ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড অনলাইনে পরিচালনা করেছে।
জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখা প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্ব পালন এবং এর এগিয়ে চলা প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাইলে লিয়াকত আলী লাকী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি যখন ক্রমেই বিকশিত হচ্ছিল তখন ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মমতার শিকার হন বঙ্গবন্ধু। সপরিবারে নিহত হন তিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠানটি এতিম হয়ে পড়েছিল। দেখার মতো কেউ ছিল না।
এরপর যারা ক্ষমতায় আসে তারা এদেশে যথার্থ শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক চর্চা এবং এর বিকাশে কোনো কাজ করেনি। তখন শিল্পকলা একাডেমির কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে শিল্প সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিককর্মী হিসেবে যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছি ।
বাংলাদেশে যাত্রাশিল্প সময়ের আবর্তনে যখন আড়ালে চলে যাচ্ছিল, মানুষ যাত্রা শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম একটি অনুসঙ্গ হিসেবে যাত্রা শিল্পকে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গত বেশ ক’বছর ধরে অত্যন্ত সফল ও কার্যকর ভ‚মিকা রেখে চলেছে বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য হলো, একটি যাত্রা কিংবা নাটক অথবা গান লক্ষ কোটি মানুষকে যেভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারে, নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে
১০০টি বক্তৃতা, বক্তব্য দিয়ে তার সমান ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। একটি নাটক কিংবা যাত্রা সাধারণ মানুষকে অন্যায়, অনিয়ম শোষণ,বঞ্চনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে পারে যেভাবে ১০ জন রাজনৈতিক নেতা বক্তৃতা দিয়েও তা করতে সক্ষম হননা।

আমরা যাত্রা শিল্পের নবজাগরণে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করেছি। এ জন্য সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বিশেষ মনোযোগ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এ জন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। তাকে ধন্যবাদ জানাই। শিল্পকলা একাডেমি এখন চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশেও অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। নিয়মিত চলচ্চিত্র উৎসব ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর
আয়োজন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়টি আলোকপাত করে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক জানান, শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রমের মধ্যে
চলচ্চিত্রকে অন্তভর্‚ক্ত করার কাজটি করে গিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তারই আগ্রহে ও উৎসাহে এবং নির্দেশনায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তার বহুমুখী কার্যক্রমে চলচ্চিত্রকে অন্তভূর্ক্ত করেছিল।
এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে। তিনি ঢাকায় এফডিসি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। যখন তিনি পাকিস্তানের শিল্প মন্ত্রী ছিলেন, ১৯৫৪ সালে চলচ্চিত্রশিল্প আইন প্রণয়ন করেছিলেন। যার আলোকে এদেশে এফডিসি প্রতিষ্ঠা এবং চলচ্চিত্র শিল্প নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চলচ্চিত্রের বিকাশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র উৎসব ও প্রদর্শনীয় আয়োজন করছে। তাছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণে এর
নানা কারিগরী বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করছে শিল্পকলা একাডেমি। ইতোমধ্যে বহুসংখ্যক তরুণ প্রতিভাবান নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মাণে দক্ষতা অর্জন করেছেন এর মাধ্যমে।
তিনি বলেন, আমরা সবসময় মনে করি সংস্কৃতি স্রেফ একটি বিনোদনের বিষয় নয়। সংস্কৃতি হলো মানুষ যে জীবনযাপন করে, যে জীবন উপভোগ করে, যে জীবনসংগ্রাম করে, সংস্কৃতি সেই জীবনটাকে উদযাপন করে। সংস্কৃতির একটি কমিটমেন্ট রয়েছে। দেশের কৃষ্টি, সাংস্কৃতিক জীবনবোধ, ঐতিহ্যকে ধারণ করে জীবনটাকে উদযাপন করতে হবে। আমরা সেই লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছি।
গত ১৩ জানুয়ারি ছিল গুণীজন, নাট্যজন, মেধাবী মানুষ লিয়াকত আলী লাকীর জন্মদিন। তিনি দীর্ঘজীবি হোন। তাঁর সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা
করছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








