ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে রাজপথে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতি চিহ্ন’। তবে ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার এই উদ্যোগ এখন তথ্যসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে গেছে। গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জন শহীদের মধ্যে ৭১ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। নাম, পিতামাতার পরিচয় কিংবা মারা যাওয়ার সঠিক তারিখ নিশ্চিত না হওয়ায় বহু স্থানে স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণকাজ থমকে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে রাজপথে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতি চিহ্ন’। তবে ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার এই উদ্যোগ এখন তথ্যসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে গেছে। গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জন শহীদের মধ্যে ৭১ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। নাম, পিতামাতার পরিচয় কিংবা মারা যাওয়ার সঠিক তারিখ নিশ্চিত না হওয়ায় বহু স্থানে স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণকাজ থমকে রয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যেসব স্থানে শহীদরা জীবন দিয়েছেন, সেই স্থান বা নিকটবর্তী সড়কে ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ নামে এসব স্মারক স্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই থেকে এ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদকে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও ‘জুলাই স্মৃতি চিহ্ন’ নির্মাণের অনেক কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলাভুক্ত না হওয়ায় ৭১ জন শহীদের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তারা কোথায় এবং কখন শহীদ হয়েছেন সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য মিলছে না। এসব তথ্য যাচাই এবং ঘটনাস্থল শনাক্ত করতে ছয় মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) চিঠি পাঠানো হয়। তবে এখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই শেষে ওই ৭১ জনের চূড়ান্ত তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। যেসব শহীদের তথ্য মামলার নম্বরসহ নিশ্চিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেই স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণ শেষ করা হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, গত বছর ‘জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা–২০২৫’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় রাজপথে স্মৃতি সংরক্ষণের একটি মহাপরিকল্পনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগকে। ওই সভায় স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি বাস্তবসম্মত প্রোটোটাইপ বা নমুনা নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। নকশা প্রস্তুত ও কাঠামো অনুমোদনের পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনগুলো নির্মাণকাজ শুরু করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় শহীদদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করবে। পরে সেই তথ্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যাচাই ও তারিখ নির্ধারণের জন্য পাঠানো হবে। যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ শহীদদের নাম, জন্ম-মৃত্যুর তারিখ এবং শহীদ হওয়ার স্থান ধাতব ফলকে নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করবে।
তবে এই সমন্বিত প্রক্রিয়ায় তথ্যের ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতা প্রকল্পটির অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো ওই ৭১ জন শহীদের নাম, পিতামাতার পরিচয় এবং শাহাদাতের সঠিক তারিখ চূড়ান্ত করতে পারেনি। ফলে অনেক স্থানে স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণ শুরু করা যাচ্ছে না এবং শহীদ পরিবারের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায় অঞ্চলভেদে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৮০টি স্মারক নির্মাণ করা হলেও উত্তরের ১৯১টির উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও অসম্পূর্ণ। ঢাকা জেলায় নির্ধারিত ৭২টির মধ্যে ২১টির কাজ বাকি রয়েছে। বাইপাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক সংস্কারের কারণে নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে। বরিশাল বিভাগে এখনো কোনো স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণ করা হয়নি, কারণ সেখানে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদের তথ্য পাওয়া যায়নি। খুলনা সিটি করপোরেশনেও এখনো কোনো স্মারক নির্মিত হয়নি, যদিও খুলনার একজন বাসিন্দা ঢাকায় শহীদ হয়েছেন।
জুলাই স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণের জন্য পৃথক কোনো কেন্দ্রীয় বাজেট নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতিটি স্মারকের জন্য গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় করছে। ফলে স্থানীয় আর্থিক সক্ষমতার ওপর কাজের গতি নির্ভর করছে এবং এতে বাস্তবায়নে অসমতা দেখা দিচ্ছে। প্রথম এক বছর ঠিকাদারের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের কথা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি তহবিল কাঠামো এখনও নির্ধারিত হয়নি। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অবহেলা বা ভাঙচুর থেকে সুরক্ষার টেকসই ব্যবস্থাও এখনো নিশ্চিত নয়। থানাগুলোকে চিঠি দিয়ে নজরদারির অনুরোধ জানানো হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সরকার প্রতিটি স্মৃতি চিহ্ন নির্মাণে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে কোথাও এই সীমার চেয়ে কম, আবার কোথাও কিছুটা বেশি ব্যয় হয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্থাপত্যগত দিক থেকে স্মৃতি চিহ্নগুলোর নকশা আলাদা দৃষ্টিনন্দনতা বহন করে। কালো হোমোজেনাস কংক্রিটে নির্মিত আট ফুট উঁচু স্তম্ভের শীর্ষে সূর্যের প্রতীকী লাল বৃত্ত স্থাপন করা হয়েছে, যা জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। জাতীয় নকশা অনুসরণ করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একই স্থাপত্যভাষায় এসব স্মারক নির্মাণ করা হচ্ছে। স্তম্ভের মাঝখানে থাকা ‘ফ্লোটিং বায়োগ্রাফি প্লেট’-এ প্রায় ৩০ শব্দে শহীদদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং জুলাই স্মৃতি নির্মাণ কার্যক্রমের সমন্বয়কারী আব্দুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজ শেষ করতে বিলম্বের প্রধান কারণ শহীদদের জীবনী প্রস্তুত, নাম-ঠিকানা যাচাই এবং পরিবারের কাছ থেকে বাণী সংগ্রহের প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতিপত্র পেতে সময় লাগায় কাজের সময়সীমা বাড়াতে হয়েছে। তিনি জানান, স্মৃতি চিহ্নগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশকেও এ বিষয়ে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।








