একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় আয়োজন করা হয়েছে।
শুক্রবার ১৯ বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আলোচনা সভায় আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা ও গণআদালতের বিচারক প্রাক্তন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।
সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সদস্য সচিব মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তপন পালিত এবং সঞ্চালনা করেন নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান নাট্যজন আসিফ মুনীর।
আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি চলচ্চিত্রনির্মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের কন্যা নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক অভিনয়শিল্পী শমী কায়সার।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ৩২ বছরের আন্দোলনের সাফল্য উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ১২ দিন আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি-জামায়াত জোট এই নির্বাচন বয়কট করলেও আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ২৮টি দল এবং কয়েক শত স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। অতীতের তুলনায় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘রাজাকারমুক্ত সংসদ চাই’ এই দাবিতে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভিযাত্রা’ নামে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালিয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ সম্পূর্ণভাবে রাজাকারমুক্ত হয়েছে। তারপরও আমাদের আন্দোলনের গুরুত্ব ও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানি হাইকমান্ড ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ঘাতক সংগঠনের বিচারের পাশাপাশি বাংলাদেশের মূল সংবিধানে বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন নির্মূল কমিটিকে যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, একইভাবে জাতীয় সংসদে যেহেতু কার্যকর বিরোধী দল নেই জাতীয় সংসদের বাইরে নির্মূল কমিটি এবং সমমনা নাগরিক সংগঠন ও উদ্যোগগুলোকে বিরোধী দলের দায়িত্বও পালন করতে হবে। জবাবদিহিতার জায়গা না থাকলে সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন ও মানবাধিকার সূচকে উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যার ব্যবস্থাপত্র রয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা আমাদের মূল সংবিধানে।
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি চলচ্চিত্রনির্মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্মূল কমিটির আন্দোলনের দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। চাইলেই এখন কেউ যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে রাজনীতি করতে পারবে না। এটা আমাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সাফল্য। এখন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দায়িত্ব তরুণদের নিতে হবে। তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবে।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, বিএনপি-জামায়াত সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দু জনসাধারণের উপর যে বর্বর আক্রমণ চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ অবস্থান নিয়েছিল নির্মূল কমিটি। যার ধারাবাহিকতায় সে সময়ে ঢাকা শহরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল যাতে বিশ্বের বহু দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার সরকারের নেতৃত্বে ঘটানো বর্বরতার তীব্র নিন্দা করেছিলেন। সে সময়ে খালেদা সরকারের প্ররোচনায় পূর্ণিমা শীল নামক ১৪ বছর বয়সী এক মেয়েসহ শত শত হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করেছিল বিএনপি-জামায়াতের দস্যুরা। এসব ঘটনার জন্য পূর্ণিমা শীলের ধর্ষকদের বিচার এবং সাজা হয়েছিল। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সেই বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ভূমিকায় ছিল। ২০০১ সালের ঘটনা তদন্তের জন্য মহামান্য হাইকোর্ট মো. সাহাবুদ্দিন, বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে যে তদন্ত কমিশন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার পেছনেও নির্মূল কমিটির দাবিকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। নির্মূল কমিটির আন্দোলন সংগ্রাম এখনও চলমান। আশা করছি অচিরেই তারা আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর ধর্মনিরপেক্ষ এক মানবিক বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে।
নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ৭১-এ যে সব দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তারা আজও স¦াধীনতাবিরোধী জামায়াত-বিএনপিকে শুধু সমর্থনই নয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজে মদদ জোগাচ্ছে। দেশবাসী নিশ্চয়ই দেখেছেন কীভাবে অতীতের মতোই বিএনপি-জামায়াত চক্র দেশের মানুষ, সম্পদ, সব রকম উন্নয়ন অগ্রগতির বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশকে পিছিয়ে দেবার জন্যে, উন্নতি ব্যাহত করার জন্যে যা কিছু দরকার সব চালিয়ে যাচ্ছে। দেশ ও জাতিবিরোধী এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে হবে।
নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান নাট্যজন আসিফ মুনীর বলেন, বর্তমান সরকার যখন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশের অঙ্গিকার করে দেশ পরিচালনা করছে, এই স্মার্ট বাংলাদেশের সুবিধাভোগী হিসেবে এগিয়ে আছে প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী, উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠন এবং তরুণ সম্প্রদায়। যোগাযোগ, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক অবকাঠামোর উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বধ্যভূমি, নিদর্শন সংরক্ষণের অবকাঠামো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এইসব ক্ষেত্রে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সামনের দিনের তরুণ ও নতুন নেতৃত্বকে জাহানারা ইমাম-শাহরিয়ার কবির-কাজী মুকুলের দেশপ্রেম, সাহস, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শে অনুপ্রাণিত ও সমৃদ্ধ হয়ে চলমান ও অবশ্যম্ভাবী প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলার জন্য কাজ করতে হবে।
আলোচনা সভার মূল প্রবন্ধে নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সদস্য সচিব মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তপন পালিত বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। নির্মূল কমিটির অব্যাহত আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্যে দিয়ে নির্মূল কমিটির আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা আরো সুদৃঢ় হয়েছে। ৭২-এর সংবিধানের আলোকে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র যতদিন না প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ততদিন নির্মূল কমিটির আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের কন্যা নির্মূল কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক অভিনয়শিল্পী শমী কায়সার বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার জন্য আমাদের অনেক অপমান-অপদস্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সাহস যুগিয়ে ছিলেন শহীদজননী জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামাল এবং নির্মূল কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। আমাদের আন্দোলনের ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ হয়। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এখনো আমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মে বিভিন্ন কনটেন্ট, নাটক তৈরি করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীনির্ভর বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার বাড়াতে হবে যেন তরুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারে।
নির্মূল কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা ও গণআদালতের একমাত্র জীবিত বিচারক প্রাক্তন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ নির্মূল কমিটির ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভা আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে এবং তরুণদের প্রতি প্রত্যাশা রেখে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, যে কাজগুলো করলে দেশ ও দশের উন্নতি হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয় তা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে করতে হবে।








