২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের কালরাত্রির স্মরণে আয়োজিত এক সমাবেশে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দরা জানান, তারা ৭১ এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চান।
আজ ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের উদ্যোগে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন পশ্চিম গ্যালারির নিচে শাহবাগ ঢাকায় , ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে অন্ধকারে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের নির্দেশে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর জঘন্য হত্যাযজ্ঞের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে জনসমাবেশ, শ্রদ্ধা নিবেদন ও গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, জয়ন্তী রায়, অসিত বরন রায়, সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জহির, সাংগঠনিক সম্পাদক সামসুল আলম জুলফিকার প্রমূখ। সভায় ঘোষণা পত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ। সভা সঞ্চালন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক একে আাজাদ।
সভাপতির বক্তব্যে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আমরা জাতি হিসেবে গর্ব বোধ করি, আমরা বীরের উত্তরাধিকার বহন করে চলছি, ১৯৭১ সালের এইদিন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক মূলত জনগণের ওপর নির্মতায় মেতে ওঠে, আমরা এই নির্মম হত্যার বিচার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করছি।
সমাবেশের ঘোষণায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে এক বর্বর সামরিক অভিযানের মধ্যে দিয়ে যে গণহত্যার সূচনা করেছিল তা পরবর্তী ৯ মাস সারা বাংলাদেশ জুড়ে অব্যাহত ছিল। এই ধারাবাহিকতায় ৩০ লক্ষের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যাকাণ্ড এবং ৪ লক্ষেরও বেশি নারী যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতের এই সেনা অভিযানের সাংকেতিক নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট।’ বাঙ্গালী জাতির সত্তাধিকারের দাবিকে চিরতরে স্তব্দ করে দিতে ঢাকায় এই অপারেশন চালানো হয়।
এই অপারেশনের ইনচার্জ মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা তার লেখা এক বইয়ে অপারেশন সার্চলাইটের মূল পরিকল্পনাকে উল্লেখ করেছেন এভাবে: ১. যে কোন ধরনের বিরোধিতা ও বিদ্রোহকে কঠোরভাবে দমন করা। ২. বাঙ্গালি সেনা সদস্য ও পুলিশকে নিরস্ত্র করা হবে। বিশেষ করে পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের অস্ত্রাগার, রাজারবাগের রিজার্ভ পুলিশ ও চট্টগ্রামের কুড়ি হাজার রাইফেলের অস্ত্রভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নেয়া। ৩. অপারেশন শুরুর সাথে সাথে সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ঘিরে ফেলা এবং তল্লাশী করা। ৫. শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবিত অবস্থায় ধরা এবং ১৫জন আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতার বাড়িতে তল্লাশী চালানো এবং তাদের গ্রেফতার করা।
মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা এবং এর আনুষ্ঠানিকতা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হলেও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে। রাত ১০টার দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয় যুদ্ধ সাজে শহরের দিকে রওনা হয়। শহরমুখী এই সামরিক বহরটি প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেটে। বড় গাছের গুড়ি, অকেজো স্টিম রোলার, ভাঙ্গা গাড়ির স্তুপ জমিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। রাত ১১টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন ঘিরে ফেলে। এই আক্রমণের খবর তাৎক্ষতিকভাবে সব জেলা ও মহকুমায় বেতার বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়। প্রায় একই সময় পিলখানায় ইপিআর- এর ওপর হামলা চালানো হয়।
একই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারী বাজারসহ সারা ঢাকাতে শুরু হয় সশস্ত্র আক্রমণ। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাতের অন্ধকারে গুলি, বোমা আর ট্রাকের আওয়াজে ঢাকা নিরীহ সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র, নিরাপরাধ, ঘুমন্ত সাধারণ বাঙ্গালির ওপর যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার নজির।
২৫ মার্চ ১৯৭১ এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ২০০১ সাল থেকে ব্যক্তি ও বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ শুরু করা হয়। কিন্তু সেই সময়ে সরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ না থাকায় ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়, পরবর্তীতে জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে।
বাংলাদেশে ২০১৭ সাল থেকে এ দিনটি ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে পরবর্তী প্রায় নয় মাস ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, জাতিসংঘের গণহত্যার সংজ্ঞায় এটি অবশ্যই গণহত্যা। দেশে বিদেশে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষ্য প্রমাণসহ এর দলিল রয়েছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার বিপরীতে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এগারো হাজার পাঁচশরও বেশি বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা গণহত্যার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে গেলেও, নয় মাসের গণহত্যার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য এখন চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সরকারের কার্যকর তৎপরতার দাবিও জানানো হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে।








