রাজশাহী থেকে হামের সংক্রমণে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শোকে ভাসছে দেশ। সামনে আসছে ‘ভ্যাকসিন হিরো’, বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রম‘ ইপিআই’র হঠাৎ ছন্দপতনের পেছনের কারণ। আর তখনই সামনে আসছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং সর্বশেষ অন্তবর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে শিশু স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসিনতা। এসব কারণে বিপাকে এদেশের অন্যতম সফল ‘ইপিআই’র নিয়মিত টিকাদানের রুটিন টিকাদান। কেন সংকট ঘটলো এবং ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন কার্যক্রম’ মুখ থুবরে পড়ার পিছেনের নানান ঘটনা আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে। চলছে রাজনৈতিক কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির পুরানো এবং নিন্দনীয় সেই টানাহেচড়াও।
তবে মায়ের কোল খালি করে একের পর এক নবজাতক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগে-উৎকন্ঠায় অভিভাবক মহল। ইতিমধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় ভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে চলছে বিশ্লেষন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজেদের মত পৃথক পৃথক তদন্ত কমিটি করেছে। সর্বশেষ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে ‘সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর’ এবং ঢাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের ‘টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির বিশেষজ্ঞরা হঠাৎই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পরার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি‘ ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ। তিনি বলছেন, তদন্ত কাজ চলমান। তবে তাদের এখন মূল লক্ষ্যই হলো যত দ্রুত সম্ভব দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ে টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে টিকার ঘাটতি পূরণের কাজটি জরুরি ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করছেন তারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থের জরুরি বিবেচনায় টিকা ক্রয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে, ফলে ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি ছাড় হয়েছে। তিনি বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের জীবন রক্ষাকারী ১০টি প্রাণঘাতি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় সরকারের ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির’ আওতায় বিনামূল্যে শিশুদের ‘ইপিআই টিকা প্রাপ্তি সহজলভ্য ও নিশ্চিত করতে চান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে টিকার সংকট কাটানো সম্ভব হবে বলেও আশাবাদী তিনি।
মূলত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে এদেশের নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি ইপিআই’র টিকাদান কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ের ছন্দপতনের বাস্তব নগ্নঅবস্থা সামনে এসেছে। পর্যায়ক্রমে রাজশাহী অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অংশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে।
তবে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে: এদেশের সবচেয়ে সফল ও বৈশ্বিকভাবে যে বাংলাদেশ শিশুদের টিকাদান ও ১০টি প্রাণঘাতি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার সাফল্য পেয়েছে, সেই দেশে হঠাৎ কেন হামের প্রার্দভাব দেখা দিলো?
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অস্থিরতা এবং এ খাত পরিচালনায় প্রক্রিয়াগত পন্থা ব্যাহত হওয়ার মত কয়েকটি বিষয় ঘটেছে। সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন:
প্রথমত: দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা।
দ্বিতীয়ত: অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মত জটিল ও মাল্টিসেকটোরাল খাতের অন্যতম জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ঠ খাত সম্প্রসারিত টিকাদান কতার্যক্রম-ইপিআই’র টিকাদান ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের অপারেশনাল প্ল্যান-ওটি বাতিল।
তৃতীয়ত: দুই বছরের কম সময়ে তিন দফায় শাসন ক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট সেকটরের চেয়ারে পরিবর্তন ঘটেছে। এই সময় মাঠপর্যায়ের হেলথ এ্যাসিট্যান্টরা তিন দফায় তাদের পদের গ্রেড উন্নয়নের দাবিতে ধর্মঘট করেছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে নবজাতক ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের বিনামূল্যে নিয়মিত ও রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
আসলে সম্প্রসারিত টিকাদানের (ঊচও) আওতায় আজ একটি শিশুর জন্ম হলেই সরকারি ভাবে বিনামূল্যে ১০টি টিকা পেয়ে থাকে! দুই ডোজে “হামের” প্রথম টিকা পায় শিশুর ৯ মাস বয়সে। দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। ইপিআই থেকে হলুদ একটি টিকা কার্ডের মাধ্যমে সকল টিকার সময় ও ডোজ সম্বলিত একটি জরুরি ডকুমেন্ট এই কার্ড শিশুর পরিচয়ের প্রথম নিবন্ধন সনদও বটে। শিশুরা যে মারাত্মক যে ১০টি রোগের সুরক্ষায় টিকা পায় সেগুলো হলোঃ যক্ষ্মা, পোলিও, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলা ।
ইতোমধ্যে ইপিআইয়ের মাধ্যমে চলমান টিকা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ৬টি টিকা যেমন: এমআর রুবেলা বা হাম ম্যাজেলস, পেন্টা ডোজ মানে ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুংস্টকার, হোপাটাইটিস-বি, হেমোফেলিয়া ও নিউমোনিয়ার এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন ওপিভির মত অতি গুরুত্বপূর্ণ টিকা মাঠ পর্যায়ে সংকট আছে। এমন বাস্তব পরিস্থিতিতে সঙ্গত কারণেই হামের সংকট এদেশের নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় হুমকি বলছেন সংশ্লিষ্ঠরা। এক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী হামের প্রাদুর্ভাব আরো সংক্রমিত হবার আগেই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে করণীয় কয়েটি পরামর্ম দিয়েছেন। হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে দুটি পরামর্শ অবিলম্বে কার্যকর করারও কথা বলছেন তিনি। ইপিআইতে দীর্ঘ দিন কর্মরত এই টিকা বিশেষজ্ঞ, অবিলম্বের দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সকল শিশুদের হামের টিকা দিতে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নেওয়ার জোর আহ্বান জানান।
আরেকটি হলো: মাঠ পর্যায়ে টিকার সংকটের এই সময়ে নবজাতক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের বাড়তি সচেতন থাকার পরামর্শ তার। বিশেষ করে এসময় বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যেভাবে হাঁচি কাঁশির মাধ্যমে সংক্রমন ছড়ানো ঠেকাতে জনগনকে যে শিষ্ঠাচার মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই শিষ্টাচার আবারো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এই টিকা বিশেষজ্ঞ সর্তক করে বলছেন, হাম সংক্রমণের এই সময়ে গর্ভবতী মায়েদের বিশেষ সতর্কতা জরুরি। গর্ভবর্তী মায়েদের জনবহুল এলাকা, জ্বর সর্দিকাশিতে আক্রান্তদের এড়িয়ে চলা এবং নাক মুখ ঢেকে হাঁচি ও কাশির সেই শিষ্টাচার মেনে চলতেই হবে। তা না হলে গর্ভবর্তী মায়েদের নানান জটিলতা ছাড়াও তাঁর গর্ভের শিশুরাও শারীরিক নানান ত্রুটি নিয়ে জন্ম নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন এই টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী।








