বছরের পর বছর ধরে প্রায় ক্রমাগত যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা মোকাবেলায় লেবানিজরা এআই-এর দিকে ঝুঁকছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এই প্রতিবেদনে অনুযায়ী লেবাননে ২০১৯ সালের আর্থিক সংকট মানুষের জীবন সঞ্চয়কে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ভেঙে পড়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং দক্ষিণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ আক্রমনের ফলে প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল বলে যায়।
বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ, বিশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লেবাননের জনসংখ্যার উপর মানসিক আঘাত তীব্রতর হয়ে উঠছে বলে জানা যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদাররা দেশজুড়ে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, পিটিএসডি এবং মনোদৈহিক লক্ষণগুলোর নাটকীয় বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী, সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিক এবং মাঠে কাজ করা মানবিক কর্মীদের মধ্যে এ লক্ষণগুলো প্রকট আকার ধারন করেছে। কিন্তু যে দেশে থেরাপি সেশনের খরচ ৪০ ডলার থেকে ১০০ ডলার সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা একরকম বিলাসিতা মনে করেন অনেকেই।
বৈরুতের সিপিআরএম ক্লিনিকের একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. রান্ডা বারাজা বলেন, “মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য কোনও জাতীয় কৌশল নেই, আমরা কেবল সাম্প্রতিক যুদ্ধ থেকে নয়, বরং লেবাননের সহিংসতার সমগ্র ইতিহাস, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক পতন থেকেও মানসিক আঘাতের পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। এই আঘাতটি সম্মিলিত, এবং এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিস্তৃত।”
ডা.বারাজা রোগীদের মধ্যে মানসিক সহায়তার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়টি লক্ষ্য করে বলেন, “আমরা মানসিক সহায়তার জন্য এ আই সরঞ্জামগুলির দিকে ঝুঁকে পড়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ্য করছি, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তারা এতে আস্থা রাখে, সান্ত্বনা খোঁজে, এমনকি তাদের রোগ নির্ণয়ের জন্যও এটির সাহায্য নেয়। এটি এমন কারো অথবা এমন কিছুর গভীর প্রয়োজনকে প্রতিফলিত করে যা কেবল শোনে।”
কিন্তু তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, “চ্যাটজিপিটি প্রকৃত মানসিক সংযম প্রদান করে না। এটি নিরাময়ের জন্য প্রয়োজনীয় মানব সংযোগের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। আরও বিপজ্জনকভাবে, এটি পেশাদার সাহায্যের এক্সেস বিলম্বিত করতে পারে। লোকেরা মনে করে যে তারা উন্নতি করছে, কিন্তু প্রায়শই তারা তা করে না।”
এদিকে, প্রায় ৯০ হাজার লেবাননের মানুষ তাদের গ্রামগুলির ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞ এবং কিছু কিছুতে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতির কারণে বাড়ি ফিরতে পারছে না। ইসরায়েলি রকেটগুলোও হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননের দুই সন্তানের জননী ৩৪ বছর বয়সী জয়নাবের জন্য ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মানসিক ক্ষতগুলো যেকোনো শারীরিক ধ্বংসের চেয়ে গভীর এবং স্থায়ী প্রমাণিত হয়েছে।
জয়নাব বলেন, “ড্রোনের শব্দ আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। আহমেদ কাবুরের ‘ইয়া রায়েহ সাওব ব্লাদি’ (ওহ, তুমি যে আমার দেশে যাচ্ছো) গানটি শুনলে আমার কান্না আসে কারণ এটি আমাকে আমাদের হারানো জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
গত নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক মাস পরও, ভয় এখনও রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং বারবার নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে। যদিও ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণের কৌশলগত অংশগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জয়নব বলেন, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তিনি ঘুমাতে পারছেন না। তিনি আরও বলেন, “আমি ক্রমাগত ভয় পাই যে, আমার সন্তানদের সাথে কিছু একটা ঘটবে। আমার মনে হয় না এই যন্ত্রণা কখনো দূর হবে।”
এর ফলে একটি সহজলভ্য, কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাবে জয়নব লেবাননের অনেকের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চ্যাটজিপিটির দিকে ঝুঁকে পরেছেন।।
চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে মানসিক স্বাস্থ্য “স্ব-পরীক্ষা” নামক একটি ফেসবুক পোস্ট পড়ার পর, জয়নব পরীক্ষা করার চেষ্টা করেন। জয়নবের অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক ছিল। এটি পিটিএসডি, সিজোফ্রেনিয়া এবং এডিএইচডি কে সম্ভাব্য রোগ নির্ণয় হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছিল।
তিনি বলেন, “এটি আমাকে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু আমি থেরাপির খরচ বহন করতে পারছিলাম না। আমি একটি বিউটি সেলুনে কাজ করি এবং মাসে ৪০০ ডলার আয় করি। শুধু ভাড়া ১,২০০ ডলার। আমার মতো লোকেদের জন্য থেরাপি বিকল্প নয়।”








