যে কোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন। ‘বাংলাদেশের নারীদের উপর রেমালের প্রভাব’ শীর্ষক প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক নানা বিধিনিষেধ আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের কারণে নারীরা দেরিতে আশ্রয়কেন্দ্রে যান, যা তাদের আরো বেশি দুর্যোগের ঝুঁকিতে ফেলে।
এছাড়া প্রচণ্ড ভিড়াক্রান্ত আশ্রয়কেন্দ্রে তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং আলোর স্বল্পতা ও যথাযথ পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকার ফলে নারীরা অনিরাপদ বোধ করেন। এ সময় তাদের সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
গত বছর জুনে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঝুঁকি কমাতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীদের ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশন উইমেনের (ইউএন উইমেন) সহযোগিতায় এবং সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিডা)-এর আর্থিক সহায়তায় “জেন্ডার রেসপন্সিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ (জিআরডিআরআরআইবি)” শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ব্র্যাক।
মঙ্গলবার ২ সেপ্টেম্বর এই প্রকল্পের সূচনা উপলক্ষ্যে ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আব্দুল ওয়াদুদ । বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএন উইমেন, বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নবনিতা সিনহা, সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মাতিলদা স্ভেনসন; মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী গোলাম তৌসিফ; এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান।
অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী।
কর্মশালায় জানানো হয়, জিআরডিআরআরআইবি প্রকল্পটি জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করবে।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের নীতিমালা ও কার্যক্রমে জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক সমতার দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলায় দূর্বলতাগুলো কমিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ বলেন, দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনা কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনো অনেক বেশি। দুর্যোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পূর্বাভাস ও সতর্ক বার্তার আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণের উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে কার্যকর প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে দুর্যোগ ঝুঁকি বিমা চালু করার জন্য যথাযথ অর্থায়নের প্রয়োজন।
নবনিতা সিনহা বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সহনশীলতায় অগ্রণী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখানে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেন্ডার (লিঙ্গভিত্তিক) সমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নারীরা ইতোমধ্যেই সম্মুখসারিতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নারীদের আরও শক্তিশালী নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
মাতিলদা স্ভেনসন বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেন্ডার (লিঙ্গভিত্তিক) সমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি অপরিহার্য। অগ্রগতি অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতিগুলোকে কাজে রূপান্তর করতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সব ধরনের পরিকল্পনায় লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ ও তথ্য ব্যবহার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নারীর নেতৃত্বে দুর্যোগে সহনশীলতা অর্জনের উদ্যোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কাজী গোলাম তৌসিফ বলেন, নারীরা জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তাদের নেতৃত্বের দক্ষতা উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগগুলো একটি লিঙ্গভিত্তিক-সংবেদনশীল দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে, যা নারী ও কিশোরীদের দুর্যোগ প্রস্তুতি ও মোকাবিলায় আরও বড় নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে প্রস্তুত করবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে ঝুঁকি কমাতে নারী, শিশু, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে যেন এসব ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মতামত শোনা যায় এবং নারীরা এ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, স্থানীয় জনসাধারণ যেন আরও ভালোভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে পারে, সেজন্য সকল প্রকল্পে জলবায়ু এবং পূর্বাভাস সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির গুরুত্ব উল্লেখ করেন তিনি বলেন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হবে। দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পগুলো সফল করতে স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্জিত জ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাকশনস-এর কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ দিলরুবা হায়দার। জিআরডিআরআরআইবি প্রকল্পের লিড আব্দুল লতিফ খান মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।
২০২৫ এর আগস্ট থেকে ২০২৬ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ জেলা কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ভোলা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, খুলনা এবং সাতক্ষীরায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে একটি জেন্ডার সংবেদনশীল জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা।
এর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনসাধারণের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জেন্ডার ইন হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন (জিআইএচএ) ওয়ার্কিং গ্রুপ এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে আরো শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা।








