এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে নামটি উচ্চারিত হলেই শ্রদ্ধা, আবেগ আর গর্ব একসঙ্গে ভর করে— তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া তার অভিনয়জীবন কোনো রাজসিক মঞ্চে নয়, গড়ে উঠেছিল কঠিন সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর নিরন্তর সাধনার ভেতর দিয়ে।
১৯৪১ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্ম নেন আব্দুর রাজ্জাক। আজকের বাংলাদেশের মাটিতে নয়, দেশভাগের আগের অখণ্ড ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ভয়াবহ দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বহু মানুষ ভিটেমাটি ছাড়লেও রাজ্জাকের পরিবার তখন নিজ জন্মভূমিতেই থেকে যায়। সেই উত্তাল সময়, দাঙ্গা ও বিভেদের ভেতরেই বড় হয়ে ওঠেন এক কিশোর- যিনি একদিন হয়ে উঠেন বাংলা সিনেমার মুকুটহীন রাজা।
স্কুলের মঞ্চ থেকে অভিনয়ের নেশা
অভিনয়ের প্রতি রাজ্জাকের আগ্রহের বীজ রোপিত হয় স্কুলজীবনেই। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন এক শিক্ষকের অনুরোধে মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন তিনি। লম্বা গড়ন, সুদর্শন চেহারা আর স্বাভাবিক অভিনয়গুণে নজর কাড়ে সেই প্রথম মঞ্চাভিনয়। ভয়ের মধ্যেও সেই নাটকই তার মনে অভিনয়ের নেশা জাগিয়ে তোলে- যার প্রভাব আজও অস্বীকার করা যায় না।
এরপর কলকাতার থিয়েটারপাড়া ঘুরে ঘুরে নাটকে অভিনয় করতে থাকেন রাজ্জাক। অভিনয়ের পাশাপাশি তার মনে ঢুকে পড়ে ‘সিনেমার ভূত’। প্রথমবার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে। পরে ‘শিলালিপি’সহ আরও কয়েকটি ছবিতে কাজ করলেও তার চোখ ছিল আরও বড় স্বপ্নে—ফিল্মস্টার হওয়ার স্বপ্নে।
স্বপ্নের পিছু ধাওয়া আর দেশান্তর
ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার আশায় ষাটের দশকের শুরুতে মুম্বাই যান রাজ্জাক। সেখান থেকে ফিরে কলকাতায় এলেও স্বপ্ন যেন ধরা দেয় না। এরই মধ্যে ১৯৬৪ সালে আবার শুরু হয় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পরিবারহীন আব্দুর রাজ্জাক এবার বাধ্য হন জন্মভূমি ছেড়ে পূর্ব বাংলায় আসতে।
দেশান্তরিত হলেও তিনি নিজের স্বপ্ন ছাড়েননি। ঢাকায় এসে থিয়েটার ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের মানুষদের খুঁজে বেড়াতে থাকেন। সুযোগ পাওয়া যে সহজ নয়, তা বুঝলেও মন থেকে ফিল্মস্টার হওয়ার স্বপ্নকে কখনো বিদায় জানাননি।
এই সময় পাকিস্তান টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘ঘোরাও’-তে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। টেলিভিশনে নিজের সামর্থ প্রমাণ করলেও তার তৃপ্তি ছিল না—কারণ তার লক্ষ্য একটাই, সিনেমা।
নায়ক রাজে উত্তরণ
নির্মাতা আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে পরিচয় রাজ্জাকের জীবনে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তার সহায়তায় কামাল আহমেদের ‘উজালা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন রাজ্জাক। এখান থেকেই ধীরে ধীরে নিজের মেধা, পরিশ্রম আর অভিনয়ক্ষমতায় জায়গা করে নেন মূলধারার সিনেমায়।
স্বাধীনতার আগে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে প্রথমবার নায়ক হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন তিনি। পরে ‘জীবন থেকে নেয়া’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে আরও দৃঢ় করেন নিজের অবস্থান। তবে স্বাধীনতার পরই ঘটে তার পূর্ণ বিকাশ।
সত্তর দশকের রাজত্ব
সত্তর ও আশির দশকজুড়ে রাজ্জাক হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত নায়ক। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘স্বরলিপি’, ‘মনের মতো বউ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ বউ’- এমন অসংখ্য কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমাকে পৌঁছে দেন নতুন উচ্চতায়।
শাবানা, ববিতা ও কবরীর সঙ্গে তার জুটি আজও বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে অম্লান। উর্দু ও হিন্দি ছবির দাপটের সময়েও তিনি প্রমাণ করেছিলেন- বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তি এখানেই।
অভিনেতা ছাড়াও নির্মাতা
শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না নায়করাজ রাজ্জাক। তিনি পরিচালনা করেছেন ১৬টি চলচ্চিত্র। তার প্রতিষ্ঠিত রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের ব্যানার থেকেও নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে তাকে দেওয়া হয় স্বাধীনতা পুরস্কার (দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান)।
চিরন্তন নায়করাজ
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন নায়করাজ রাজ্জাক। শারীরিকভাবে তিনি নেই, কিন্তু তার সৃষ্টিশীলতা, অভিনয় আর অবদান যুগ যুগ ধরে বাংলা চলচ্চিত্রকে অনুপ্রাণিত করবে। তার জন্মদিন উদযাপনে চ্যানেল আইয়ে সম্প্রচার হচ্ছে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান।








