রুহের জগতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত নবীদের পক্ষ থেকে ওয়াদা নিয়েছিলেন। রুহের জগত বলতে মানবসৃষ্টির পূর্বে মানবসমূহের রুহের সাথে আল্লাহ তায়ালার কথোপকথনের মূহুর্তের কথা যা কুরআন পাকে বর্ণিত আছে। সেখানে সকল নবীকে নবুওয়ত দেয়া হয়েছিল। তবে তাঁদের এই শর্তে নবুওয়ত দেয়া হয়েছিল যে, শেষনবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন পৃথিবীতে আসবেন, তাঁর প্রতি তোমরা একনিষ্ঠ ইমান আনয়ন করবে এবং তাঁর সাহায্যে আত্মনিয়োগ করতে হবে। এই শর্তে যারাই রাজি হয়েছিলেন, তাঁরাই নবুওয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দ.) যে সর্বশেষ আগমনকারী নবী বা খাতামুন্নাবিয়্যীন হবেন, এ বিষয়টি কোনো নতুন বিষয় নয়। এটি সৃষ্টিজগতের প্রাচীনতম বিষয় যা রুহের জগতেই আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল।
খাতামুন্নাবিয়্যীন অর্থ নবীগণের সর্বশেষ আর খতমে নবুওয়ত অর্থ নবুওয়তের পরিসমাপ্তি। যার মাধ্যমে এই পরিসমাপ্তির ঐতিহাসিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, তিনিই আমাদের নবী। প্রিয়নবী নিজেই বলেন- ‘আমি সৃষ্ট হয়েছি নবীদের সবার আগে। আর প্রেরিত হয়েছি সকল নবীর পরে’ (তাফসীরে ইবনে কাছীর)। এই হাদিসটি সেই দিকেই ইঙ্গিত করে, যা আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
খতমে নবুওয়ত বিষয়ে পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যা থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের নবী হজরত মোস্তফা (দ.) সর্বশেষ নবী। আল্লাহ পাকের বাণী: ‘মুহাম্মদ (দ.) তোমাদের কোনো পুরুষ সন্তানের পিতা নন বরং তিনি রাসূলুল্লাহ এবং সর্বশেষ নবী’ (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪০)। এ আয়াতের ভাষা সুস্পষ্ট। ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন ছাড়াই একথা মেনে নেয়া যায় যে, প্রিয়নবীজির মাধ্যমেই নবুওয়তের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
এখানে একটা চমৎকার হেকমতপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তায়ালা খাতামুন্নাবিয়্যীন বলার আগে ‘মুহাম্মদ (দ.) তোমাদের কোনো পুরুষ সন্তানের পিতা নন’ একথা কেন বললেন? শেষনবী হওয়ার সাথে এর সম্পর্কই বা কী?
উক্ত প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, পূর্ববর্তী নবীগণের যুগগুলোতে কোনো নবীর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান উপযুক্ত হলে নবুওয়তের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই বর্তিত হত। উম্মতের নবী হিসেবে প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা তাঁরই বেশি থাকত। যেমন, হজরত ইবরাহীমের সন্তান ইসমাইল ও ইসহাক, এয়াকুবের সন্তান ইউসুফ ইত্যাদি। এমন আরও অসংখ্য নবীর সন্তান নবীরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। নবীর সন্তান উপযুক্ত হওয়ার অর্থ নবী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া। সেই সম্ভাবনা আমাদের নবীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা নাকচ করে দিয়েছেন। একদিকে প্রিয়নবীর ছোট্ট শিশু সন্তানকে বড় হবার আগেই তুলে নিয়ে গেছেন৷ অন্যদিকে পালকপুত্র জায়েদের পিতা তিনি নন, একথা জানান দেয়ার মাধ্যমে বার্তা দেয়া হচ্ছে, তিনিই সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কারোই নবী হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
সেকারণেই প্রিয়নবী (দ.) নিজেই বলেছেন: ‘আমি খাতামুন্নাবিয়্যীন। আমার পরে আর কোনো নবী নেই’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, মিশকাত, মুসনাদে আহমদ)। এরদ্বারা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত খাতামুন্নাবিয়্যীন অর্থও পরিস্কারভাবে প্রতিভাত হয়ে গেল। খাতামুন্নাবিয়্যীন অর্থ শেষনবী, এটাই চূড়ান্ত। তারমানে খাতামুন্নাবিয়্যীন বলতে মূলনবী বা শ্রেষ্ঠনবী, এমন কোনো অর্থ গ্রাহ্য হবে না। এই হাদিসের ব্যাখ্যা দ্বারা কুরআনের চূড়ান্ত আয়াতটির অর্থ কী, তা সূর্যের আলোর ন্যায় প্রস্ফুটিত। অতএব এখানে কাদিয়ানী ফির্কা যে অপব্যাখ্যা এবং অর্থচুরির প্রয়াস চালায়, মূলত তার সাথে কুরআন বা হাদিসের কোনো সামঞ্জস্যতা নেই।
নবী কারিম (দ.) এর পরে নতুন করে কারো নবী দাবি করা কিয়ামতের আলামতের অন্তর্ভুক্ত। কাদিয়ানি ফির্কা নবুওয়ত দাবিও তা-ই। হাদিসে এসেছে: ‘ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতক্ষণ না প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের উত্থান হবে। যারা প্রত্যেকেই মনে করবে, সে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল’ (বুখারী ও মুসলিম)। এ হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, প্রিয়নবীর পর যারাই নবী দাবি করেছে তারা কেউই নবী তো ছিল না; বরং কিয়ামতের আলামতের অংশ হিসেবে দাজ্জালরূপে আবির্ভূত ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, খাতামুন্নাবিয়্যীন অর্থ শেষনবী, এটা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক মুসলমানের বিশ্বাস হয়ে আসছে। ১৪ শত বছরে ইতিহাসে কোনো যুগে এব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয় নি। মুসলমান সমাজে কুরআন-হাদিসের যে বিষয়টি সকলে জানে এবং মানে, তা অকাট্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে জরুরীয়্যাতে দ্বীন বা দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয়ে পরিণত হয়। আর দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয়ে অস্বীকার কুফরির নামান্তর। অতএব এ দৃষ্টিকোণ থেকেও, খতমে নবুওয়ত অস্বীকার করা কুফরি। আর কুরআনের আয়াত অস্বীকার করাও তো তা-ই। সুতরাং এমন সুস্পষ্ট একটি বিষয় অস্বীকার করে কেউ মুসলমান দাবিদার হতে পারে না।
প্রিয়নবীর (দ.) একটি গুণবাচক নাম আকিব। যার অর্থ নবীগণের মধ্যে সর্বশেষ আগমনকারী। যার পরে আগমনকারী দ্বিতীয় কোনো নবী নেই। জুবাইর বিন মুত্বইম (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (দ.) ইরশাদ করেন: ‘আমার পাঁচটি নাম। আমি মুহাম্মাদ, আহমাদ। আমি মাহী তথা নিশ্চিহ্নকারী। যার দ্বারা আল্লাহ তায়ালা কুফরী নিশ্চিহ্ন করবেন। আমি হাশির। যার কদমতলে মানুষের হাশর হবে। আর আমি হলাম আকিব তথা সবশেষে আগমনকারী। আর আকিব তাঁকেই বলা হয়, যার পরে কোন নবী নেই’ (বুখারী ও মুসলিম)।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের এসকল তথ্যের আলোকে ওলামায়ে কেরাম এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবী কারিম (দ.) সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে কোনো নবী আগমন তো দূরের কথা এর বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও নেই। সেকারণে খতমে নবুওয়তে বিশ্বাস করা একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। এতেই ইমান নিহিত। এর বিপরীত মতপোষণের সাথে ইসলাম-ইমানের কোনো সম্পর্ক নেই।







