একটা সময় দুর্গা পূজা হতো রাজ-রাজাদের প্রাসাদে, নাটমন্দিরে। ঐ রাজবাড়ীর পূজাগুলোতে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে, দুর্গা-কালী-লক্ষ্মী-সরস্বতীর মত মহাপূজাগুলো চাইলেও একা একা করা সম্ভব নয়। কারণ এই পূজাগুলোর প্রক্রিয়াটা খুব জটিল। এজন্যই এগুলো মহাপূজা।
সেকালে রাজ প্রাসাদে পূজা হলেও পূজা বাড়ীতে গোবরজল দিয়ে উঠোন নিকোতে একজন বিধবা মহিলার প্রয়োজন হতো, পদ্মফুল তুলে আনা থেকে শুরু করে কুশ সংগ্রহ, দশকর্মাদি সংগ্রহ, ভোগ রান্নার জন্যে পাঁচক ঠাকুর, প্রদীপ বানানো, কলাগাছ সংগ্রহ, ফুল সংগ্রহ, ১০৮ পদ্ম জোগাড়, গোবর সংগ্রহে গ্রামের লোককেই লাগতো। মুড়কি তৈরী করতে ময়ড়া, শাঁখারী প্রয়োজন হত, মালাকার লাগতো, সামিয়ানা টাঙানো, তাঁতীর দরকার হত, ঢাকী লাগতো, গ্রামকে গ্রাম ভোজ হত। এত্তসব কিছু শুধু রাজ পরিবার হলেই নিজেদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। অনেক মানুষের সম্মিলন প্রয়োজন হতো পূজা করতে। এগুলোর জন্যে সাধারণ মানুষের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হতো রাজপরিবারকে।
দুঃখজনক এই, পূজাগুলোয় চাইলেই তথাকথিত নিম্নবর্ণের বা দরিদ্র শ্রেণীর প্রজারা তাদের রাজাদের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে পূজোর আমোদে মেতে উঠতে পারতো না। সমাজের নীঁচু শ্রেণী বা দরিদ্র সমাজে দুর্গা পূজার আমোদ-প্রমোদ অধরা থেকে যেত। এই বিভাজনের আক্ষেপ অনেকটাই ঘুঁচে যায় ‘বারোয়ারি’ পূজার প্রচলনে।

‘বারোয়ারি’ শব্দটির উৎপত্তি ‘বারো’ ও ‘ইয়ার’ (বন্ধু) শব্দ দু’টি থেকে। গ্রামের ১২ জন সদস্য মিলে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে এই পূজার প্রচলন করেন বলে এর নাম হয় ‘বারোয়ারি’। বারোয়ারি পূজার প্রচলন সম্পর্কে জানা যায়, সেন আমলে বাংলায় হিন্দু ধর্ম রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ও সমাজে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তৎকালীন সময়ে সেন বংশের ও তাদের পরিবারের দুর্গা পূজা রমরমা ও বহুল প্রচলিত ছিল।
আনুমানিক ১১৬৬ সালে সেন রাজবাড়ীতে বেশ জাঁকজমকের সাথে দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়। সেখানকার প্রজারা দুপুরবেলা সন্তান-সন্ততিদের সঙ্গে নিয়ে সেনবাড়ির সদর দরজায় উপস্থিত হন প্রতিমা দর্শনের জন্য। কিন্তু দ্বাররক্ষীরা তাদের প্রবেশে নিষেধ করেন। বহু প্রচেষ্টার পরও তাদের প্রতিমা দর্শনের জন্য অনুমতি না মেলায় অপমান বোধ করে তারা বাড়ি ফিরে আসেন এবং সকলকে একথা জানান। এ বিবাদের জেরেই ১২টি গ্রামের যুবকেরা মিলে তখন এই পূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।
কলকাতায় ১৯২৯ সাল থেকে ‘সিমলা ব্যায়াম সমিতি’র পূজায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশসহ বিপ্লবী ও সেইসময়ের রাজনৈতিক নেতারা যুক্ত ছিলেন এই পূজাতে। তবে সবাইকে ছাঁপিয়ে নেতাজি সুভাষ বোস ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিলেন এর সাথে। যার রেশ ধরে পূজাটি ‘নেতাজির পূজা’ নামে খ্যাত হয়। এককালের সভাপতি নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে এখনো পূজায় কোন থিম বা আধুনিক অতিশায্য তেমন প্রাধান্য পায় না। মূলত পূজাটি ছিল বিপ্লবীদের আখড়া। ১৯৭১ সালের সর্বজনীন পূজায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুও বাদ পড়েননি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের পঞ্চদশ খণ্ডে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি এ আর মল্লিকের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালে ভারতে দুর্গাপূজার মণ্ডপে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি টানানো হয়েছিল। তার বর্ণনা মতে, ‘সে সময় ভারতে বাংলাদেশের সমর্থনে এমন একটি জোয়ার এসেছিল যে, সব জায়গায় এমনকি দুর্গাপূজা মণ্ডপের প্রবেশ দ্বারেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি টাঙানো হতো’।
মুহাম্মদ নূরুল কাদির তার লেখা ‘দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘একাত্তরে মাহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বহু পূজোমণ্ডপে বঙ্গবন্ধুর ছবি ফুল দিয়ে সাজিয়ে ঠাকুরের পাশে সম্মানের সাথে রাখা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, বিষ্ণু বা নারায়ণ নরদেহ ধারণ করে ‘অবতার’ হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন, সাত কোটি বাঙালিকে রক্ষা করার জন্য। সেই কারণেই একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গে বহু হিন্দু বঙ্গবন্ধুকে দেবদূত ও পূজ্য হিসেবে মান্য করতেন।’
একাত্তরের সেই সময়ে অনেকেই ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে কিংবা প্রশিক্ষণ শিবিরে। সেই সময়ের বর্ণনা উঠে এসেছে অজয় দাশগুপ্তের স্মৃতিচাণে। তিনি বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুর্গাপূজায় ছিলাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা নামের এক বনে। পূজোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখছেন, ‘আশপাশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে দুর্গাপূজো হচ্ছে। প্রথম মন্দিরে গিয়েই আমরা অভিভূত। দেবী দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র, যে হাতে অসুরকে বিদ্ধ করা লেজা বা বল্লম (ত্রিশূল)। সে হাতেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। আমাদের ব্যারাকের মাইকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো হয়। কিন্তু অনেক দিনের মধ্যে এই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখলাম। সেটাও আবার মন্দিরে, যেখানে পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান মেনে পূজা হচ্ছে! চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এলো। মন্দির দর্শনে বের হওয়া আমাদের দলের প্রায় সকলে মুসলিম ধর্মাবলম্বী। তারাও অভিভূত! জাতির পিতা মানুষের অন্তরে কী যে আসন করে নিয়েছেন, সেটা পাহাড়ি বনের মধ্যে এমন পূজার আয়োজনে না এলে বোঝাই যেত না। যুগ যুগের সংস্কার কীভাবে ভেঙে গেল’।
এভাবেই, বিভেদ ঘুচিয়ে দিল সকলে মিলে করা ‘বারোয়ারি’ দুর্গা পূজা।
তথ্যসূত্র: সুভাষ থেকে নেতাজি, দিলীপ চাকী, আনন্দ প্রকাশন (২০১৪) ও গবেষক শ্রী সুরজিত পাল
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








