কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ১১ লাখ মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় দেওয়ার জন্য যে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানে বসেই রোহিঙ্গারা তৈরি করছে বাংলাদেশের নকল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)।
উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিপুল পরিমাণ নকল জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ, ব্যাংকের চেক ও এসব তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে রোহিঙ্গাসহ ৫ জনকে আটক করেছে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। এ ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।
বুধবার (২০ জুলাই) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরান হোসেন।
আটকরা হলেন, উখিয়ার ১ নং ক্যাম্পের (ডব্লিউ) ব্লক-এফ/১০ এর বাসিন্দা মো. ইসলামের ছেলে মো. আবদুল্লাহ (৩৭), একই এলাকার মুসা খলিলের ছেলে আবুল খায়ের (১৮), ব্লক-এফ/১৩ এর বাসিন্দা হাবিবের ছেলে মো. ত্বালহা (৬০), তার ছোট ভাই মো. হারুন (৩৬) ও টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ উত্তরপাড়ার সৈয়দ হোসেনের ছেলে মো. ইসমাঈল (৪৫)।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরান হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, উখিয়াস্থ লাম্বাশিয়া (ক্যাম্প-১ ডব্লিউ) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি চক্র রোহিঙ্গাদের জন্য নকল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছে। এ সংবাদের প্রেক্ষিতে ৮ এপিবিএন লাম্বাশিয়া ক্যাম্পের মো. আবদুল্লাহ (৩৭) এর বসতঘরে অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ নকল জাতীয় পরিচয় পত্র, নকল জন্ম নিবন্ধন সনদ, নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, নকল এনআইডি তৈরীর কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, পেনড্রাইভ, বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপিসহ জালিয়াত চক্রের ৫ সদস্যকে আটক করে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৪টি ল্যাপটপ, ৮টি স্মার্টফোন, ৪টি পেনড্রাইভ, ২টি স্ক্যানারসহ প্রিন্টার, ২৮টি অনলাইন ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন রেজিষ্ট্রেশন, ১১টি জন্ম নিবন্ধন তথ্য যাচাই, ৩০টি ডুপ্লিকেট জন্মসনদ, ২০টি ডুপ্লিকেট এনআইডি, ২০০টি বিভিন্ন ব্যক্তির এনআইডির ফটোকপি, বেশকিছু সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকের চেক বই ও জমা দেওয়ার বই, ৫টি সিল, ১টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন সনদ পত্র, ২০টি শাহপুরি বাস্তহারা আদর্শ গ্রাম সমবায় সমিতি লিঃ এর সদস্য ফরম, ৩৫টি টাকা জমা দেওয়ার পাশ বহি, ৮টি রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয়তা সনদসহ আরো বিভিন্ন নামের ৪টি জাতীয়তা সনদ, ৫টি ভূমিহীন ইলেক্ট্রিক বিলের কাগজপত্র, বিভিন্ন ধরণের জায়গা জমির দলিল ও খতিয়ান, সিটি কর্পোরেশনের জাতীয় সনদ জব্দ করা হয়।
তিনি জানান, উক্ত চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে নকল বাংলাদেশী জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে আসছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং বিদেশে গমনের জন্য পাসপোর্ট তৈরির লক্ষ্যে উক্ত দালাল চক্রকে মোটা অংকের টাকা প্রদান করে।

তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন এবং বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে এই অসাধুচক্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সনাক্তপূর্বক আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানান ৮ এপিবিএনের এই কর্মকর্তা।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশী জাতীয় নকল পরিচয় পত্র তৈরি সরঞ্জাম পাওয়ার ঘটনাটি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে জানিয়ে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা এই তৎপরতা ও শুরু করেছে। এটি জঘন্য একটি অপরাধ। সরকারের কঠোর হস্তে দমন করা প্রয়োজন। তা না হলে যে কোন সময়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সবাই বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাবে। আর সেখানে গিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ সরকারকে তার দায় বহন করতে হবে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান পিপিএম বলেন, আশ্রয় নেওয়ার রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধের নানা বিষয় দেখছেন এপিবিএন ও জেলা পুলিশ। ক্যাম্পের ভেতর থেকে বাংলাদেশী জাল জাতীয়তা সনদ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।








