সিলেট থেকে: জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথমটিতে রোববার মাঠে নামছে বাংলাদেশ। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে চিরচেনা প্রতিপক্ষ দলটিকে আতিথ্য দেবে টিম টাইগার্স। ম্যাচ শুরুর আগের দিনও যেন নিশ্চুপ সিলেট। নেই কোনো প্রচারণা। সিলেট শহর ও স্টেডিয়ামের আশেপাশে কোথাও দেখা মেলেনি প্রচারণার অংশ বিশেষ কোনো ব্যানার বা ফেস্টুন। এমনকি লাক্কাতুরায় স্টেডিয়াম সংলগ্ন টিকিট কাউন্টারও ছিল ফাঁকা। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে বলেই কী এমনটা? তবে এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ দিয়েই নতুনভাবে শুরু করতে চায় টিম টাইগার্স।
জিম্বাবুয়ের তুলনায় শক্তিমত্তায় কাগজে-কলমে বেশ এগিয়ে বাংলাদেশ। তবে টেস্টে দুদলের মুখোমুখি লড়াইয়ে কাছাকাছি পরিসংখ্যান। মোট ১৮ দেখায় ৮টিতে জিতেছে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে জিতেছে ৭টিতে। আর ড্র হয়েছে তিনটি ম্যাচ। ঘরের মাঠে বাংলাদেশ রোডেশিয়ানদের ৬ ম্যাচে হারিয়েছে, আর হেরেছে দুটিতে। সিলেটে তাই জয়ের বিকল্প ভাবছে না টিম টাইগার্স।

সিলেট টেস্টে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আবহাওয়া। বৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে পূর্বাভাসে। এমনকি ম্যাচের আগের দিন শনিবার বিকেলেও বৃষ্টি নেমেছিল লাক্কাতুরায়। বৃষ্টি বাধা কাটিয়ে খেলা গড়ালেও ঘরের মাঠে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স চিন্তার কারণ হতে পারে। গত বছর শ্রীলঙ্কা ও সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে দাঁড়াতেই পারেনি টিম টাইগার্স। সব মিলিয়ে দেশে সবশেষ ১৬ ম্যাচে জিতেছে কেবল ৩টিতে। আর দেশের বাইরে ২০২৪ সালে তিন ম্যাচ জিতেছে লাল-সবুজের দল।
ঘরের মাঠে ঘুরে দাঁড়ানোর অভিযানে প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে সবশেষ ৮ ম্যাচে জিতেছে কেবল একটিতে। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে রোডেশিয়ান শেষ টেস্ট জয়টি এই সিলেটে। ২০১৮ সালে ১৫১ রানে স্বাগতিকদের হারিয়েছিল তারা। অবশ্য সম্প্রতি ফর্মহীনতা ভুগছে জিম্বাবুয়ে। গত ৪ বছরে কোনো টেস্ট জেতেনি তারা।

শক্তিমত্তায় বাংলাদেশের তুলনায় জিম্বাবুয়ে ছোট দল হলেও বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত অবশ্য তা মানছেন না। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘না আমরা সেভাবে দেখছি না। এই জিনিসগুলো অনেক সময় আপনাদের থেকে আসে। আবার সাধারণ মানুষ যারা খেলা ফলো করেন তারা এই জিনিসগুলো তুলানা করে থাকেন। যেটা জিম্বাবুয়ে বা ছোট দল নাকি বড় দল এই জিনিসগুলো। পেশাদার ক্রিকেটে হিসেবে আমরা একটা বল বাই বল চিন্তা করি। কিভাবে ওই বলটার সঙ্গে আমরা ফাইট করে জিততে পারি।’
‘গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা কিভাবে আমাদের সেরাটা খেলাটা খেলতে পারি প্রতিপক্ষ যে দলই হোক না কেন। একটু আগে বললাম, সংস্কৃতি। আমরা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে যেভাবে খেলবো, সেই মন মানসিকতায় সেই শারিরিক ভাষা, সেই চিন্তাভাবনা যে সাউথ আফ্রিকা দলের বিপক্ষে থাকে বা একটা বড় দলের বিপক্ষে থাকে।’
‘এই জায়গায় যেন আপনাদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি না হয়। খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও যেন পার্থক্য তৈরি না হয়। আমি মনে করি আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে এরকম পার্থক্য নাই যে ছোট দলের বিপক্ষে খেলছি বা বড় দলের বিপক্ষে খেলছি। উন্নতির জায়গা আছে। আমি মনে করি, এখান থেকে আমরা সেই শুরুটা করতে পারি।’-যোগ করেন শান্ত।

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। আশানুরূপ খুব একটা সাফল্য মেলেনি এখনও। এমনকি এখনও টেস্ট সংস্কৃতিটাও গড়ে উঠেনি দেশের ক্রিকেটে। জিম্বাবুয়ে টেস্ট দিয়ে নতুন করে শুরু করতে চায় টিম টাইগার্স।
‘এতো বছর টেস্ট খেলার পরও যখন আমাদের টেস্ট সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে হয় তাহলে খুবই দুঃখজনক। তবে আমার মনে হয়, যদি গত বছর থেকে শুরু করি, আমরা চারটা ম্যাচ জিতলাম টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ১২টি টেস্টের মধ্যে। চারটি ম্যাচই বড় দলের বিপক্ষে।’
গত বছর দেশের বাইরে তিনটি টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ- পাকিস্তানের মাটিতে দুটি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে একটি। বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে নতুন কিছুর কথা শোনালেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। বলেছেন, ‘গত বছর থেকেই কীভাবে টেস্ট দলটায় একটা সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি বা আমরা কীভাবে খেলাটা খেলতে চাই এই বিষয়গুলো নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। নতুন কোচ আসার পরে তার একটা পরিকল্পনা আছে, সে আসলে কীভাবে দলটাকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যেগুলো এরই মধ্যে ক্রিকেটারদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। পাশাপাশি আমরা যারা খেলছি, আমাদের একটা ইনপুট তো ছিলই। আমি আশা করব এ বছর যে পাঁচ-ছয়টা টেস্ট ম্যাচ আছে, নতুন কিছু আপনারা দেখতে পাবেন।’

বাংলাদেশ দলে পরিবর্তন দরকার বলে মনে করছেন শান্ত। বলছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, যেহেতু আমাদের গত ২০-২২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট একই রকম ছিল, খুব বেশি উন্নতি হয়নি। তাই এই জায়গাটাতে নিশ্চয়ই আমাদের কিছু পরিবর্তনের দরকার আছে। ওই পরিবর্তনটাই করার চিন্তা করছি। আমি আশা করব যে এই পরিবর্তন আমাদের টেস্ট ক্রিকেটে কাজে লাগবে।’
একসময় বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যে ছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তা অবশ্য এখন আর আগের মত নেই। তবে নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়াইটা করতে চান জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক ক্রেইগ আরভিন।
‘আমরা খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। এমন কোনো জায়গা নেই যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করিনি। এখন শুধু মাঠে গিয়ে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার পালা এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা যে প্রস্তুতির শতভাগ আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
‘দুই দলের মধ্যে সবসময়ই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে। এবার বাংলাদেশের মাঠে খেলা হওয়ায় জিম্বাবুয়ের জন্য কাজটা কিছুটা কঠিন। তবে আমাদের সবসময়ই মনে হয় যে, সুযোগ আছে। এখন আমাদের যে ধরনের ক্রিকেটার আছে, নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য হুমকি হতে পারে।’

নতুন শুরুর প্রত্যয়ে রোডেশিয়ানদের বিপক্ষে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই নামবে বাংলাদেশ। মুশফিকুর রহিম, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক ও মেহেদী হাসান মিরাজদের মত অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি জাকের আলি, সাদমান হোসেন থাকবেন একাদশে। এছাড়া বল হাতে তাইজুল স্পিন বিভাগের অন্যতম ভরসা। পেস ইউনিটে হাসান মাহমুদ ও খালেদ আহমেদের পাশপাশি বাংলাদেশের আলোচিত পেসার নাহিদ রানা তো আছেনই।
নাহিদ রানার গতির ঝড় বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্বে অন্যতম আলোচনার বিষয়। অবশ্য সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুতিও সেরেছে জিম্বাবুয়ে। শুক্রবারের অনুশীলনের পর দলটি অলরাউন্ডার শন উইলিয়ামস বলেছিলেন, ‘বিশ্ব ক্রিকেটে এখন অনেকেই নাহিদের মতো জোরে বোলিং করেন। তাই মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে না জিম্বাবুয়ের।
উইলিয়ামসের এমন মন্তব্য ভালোভাবে নেননি শান্ত। রোডেশিয়ানদের খোঁচা মেরে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেছেন, ‘এটা কালকে ম্যাচে নাহিদ যখন বল করবে ও প্রতিপক্ষ যখন ব্যাট করবে, তখন আপনি তাদের শরীরী ভাষা দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, নাহিদ রানা কত জোরে বল করে এবং সে কতটা অসাধারণ।’

বাংলাদেশকেও অবশ্য সামলাতে হবে জিম্বাবুয়ের পেস আক্রমণের চ্যালেঞ্জ। সফরকারীদের একমাত্র বিশ্বমানের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানির সঙ্গে আছেন আরেক দীর্ঘদেহী বাঁহাতি পেসার রিচার্ড এনগারাভা। নতুন বলে বাংলাদেশের ছন্দহীন ওপেনারদের কঠিন পরীক্ষা নেবেন তারা।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ: সাদমান ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম, মেহেদী হাসান মিরাজ, জাকের আলি অনিক, তাইজুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ, খালেদ আহমেদ ও নাহিদ রানা।
জিম্বাবুয়ের সম্ভাব্য একাদশ: বেন কারেন, নিকোলাস ওয়েলচ, ক্রেইগ আরভিন (অধিনায়ক), ব্রায়ান বেনেট, শন উইলিয়ামস, ওয়েসলি মাধেভেরে, জোনাথন ক্যাম্পবেল, তাফাদজাওয়া সিগা, ওয়েলিংটন মাসাকাদজা, ব্লেসিং মুজারাবানি, রিচার্ড এনগারাভা ও ভিক্টর নিয়াউচি।







