পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেয়ার পর থেকে বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এরপর আইসিসি ও বিসিবি দফায় দফায় আলোচনার পরও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি বাংলাদেশ। সবশেষ আইসিসিরি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে (ডিআরসি) আবেদন করেছিল, সেটিও খারিজ করে দিয়েছে। তারপর বাংলাদেশ বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অর্ন্তভূক্ত করে আইসিসি। নিশ্চিত হয় বাংলাদেশ এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে না। ফলে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বিসিবিসহ বিশ্বকাপের সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে কি পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে তা তুলে ধরেছে। ওই প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, জাতীয় দলের খেলায় টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ থেকে আয় করে বিসিবি। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মূল আয়ের উৎস আইসিসি। নিয়ন্ত্রক এ সংস্থার আয়ের ভাগ পায় বিসিবি। কিছুদিন আগে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রতিবছর বিসিবির আয়ের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ আসে আইসিসি থেকে।
তিন সংস্করণে আইসিসির আয়োজিত বৈশ্বিক আসরগুলো থেকেও রাজস্বের ভাগ পায় অংশ নেওয়া দেশগুলো। শুধু অংশ নেওয়ার জন্যই দেশগুলোকে নির্দিষ্ট একটি অঙ্কের অর্থ দেয় আইসিসি। এরপর টুর্নামেন্টে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে প্রতি ধাপে ধাপে আয়ের সুযোগ থাকে। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললে এসব খাত থেকে কোনো অর্থই পাবে না বিসিবি।
আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কেমন
ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, এবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলায় প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩০ কোটি ২১ লাখ টাকা) আয়ের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলে আইসিসির বার্ষিক রাজস্বের ভাগ (আইসিসির মোট আয়ের ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ) হিসেবে এই অর্থ আয়ের সুযোগ থাকত বাংলাদেশের।
কিন্তু ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং আইসিসি ভেন্যু না পাল্টানোয় এই বিশাল অঙ্কের অর্থ আয়ের সুযোগও থাকছে না। কারণ, বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে অংশ না নেয়ায় আইসিসির অংশগ্রহণ সংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গ হবে। ফলে আইসিসি থেকে পাওয়া রাজস্ব অংশের একটি বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারণ বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
পাশাপাশি সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে পাওয়া আয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এর অর্থ হলো, একটি সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বার্ষিক আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দলগুলো শুধু অংশ নেয়ার জন্য পাবে ৩ লাখ ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ খেলতে না যাওয়ায় এই অংশগ্রহণ ফিও পাবে না। পরবর্তী সময়ে টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ধাপে উত্তরণের জন্য আলাদা করে প্রাইজমানিও পেত দল। পাশাপাশি বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলায় খেলোয়াড়েরাও ব্যক্তিগতভাবে আয়ের সুযোগ হারাবেন যার মধ্যে রয়েছে ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস ও প্রাইজমানি।
ভারতীয় সংবামাধ্যম ‘রেভস্পোর্টজ’ জানিয়েছে, বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেয়ায় দেশের অফিশিয়াল সম্প্রচারক টিভি চ্যানেল টি স্পোর্টস প্রায় ৩০০ কোটি টাকা লোকসানের সম্মুখীন হতে পারে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানও প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে পারে। উপমহাদেশে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সাধারণত টিভিতে দর্শক টানে। বাংলাদেশ না খেললে তাই বিজ্ঞাপনদাতা ও স্পনসরদের আগ্রহেও ভাটা পড়তে পারে।
২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের তুলনায় এবার প্রাইজমানি ২০ শতাংশ বাড়িয়েছিল আইসিসি। এদিক বিচারে আর্থিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষতিটা আসলে বেশ বড়ই। যেমন ধরুন, শুধু গ্রুপ পর্বে ও সুপার এইটে প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য ৩১,১৫৪ ডলার বোনাস পাবে প্রতিটি দল। পঞ্চম থেকে ১২তম স্থানে থাকা প্রতিটি দল পাবে সাড়ে ৪ লাখ ডলার করে। সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দল পাবে ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার করে। রানার্সআপ ১৬ লাখ ডলার এবং চ্যাম্পিয়ন দল ৩০ লাখ ডলার প্রাইজমানি পাবে।
সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার গ্রহণযোগ্য কারণ বাংলাদেশ যদি আইসিসির কাছে তুলে ধরতে না পারে তাহলে বিসিবিকে প্রায় ২০ লাখ ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা জরিমানাও গুনতে হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
এ বছর সেপ্টেম্বরে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের। বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারত না এলে এবং সিরিজটি বাতিল হলে প্রচুর অর্থ আয়ের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট। কারণ, ভারতের সঙ্গে সিরিজ মানেই সম্প্রচারক ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর তুমুল আগ্রহ। আর বাংলাদেশ যেহেতু ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাই ভবিষ্যতে ভারত এ দেশে এসে না খেললে বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের সুযোগ থাকবে না বিসিবির। অন্য কোনো দেশের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের তুলনায় ভারতের বিপক্ষে খেললে আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে।
আইসিসির বর্তমান রাজস্ব বণ্টন নীতি অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৭ চক্রে বছর প্রতি ৩২৭ কোটি টাকা করে পাওয়ার কথা বিসিবির। যেহেতু আইসিসির ডাকে সাড়া না দিয়ে বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে না, তাই ২০২৮ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য রাজস্ব বণ্টন নীতিতে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে আইসিসি। পাশাপাশি আইসিসির বিভিন্ন কমিটি থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতিনিধিরা বাদ পড়তে পারেন। ভোটাধিকারও করা হতে পারে সীমিত।
ক্রিকেটীয় ক্ষতির জায়গাও আছে। এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলায় আগামী টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সরাসরি খেলার সুযোগ নাও থাকতে পারে। বাছাইপর্ব খেলে মূল পর্বে ওঠার পরীক্ষা দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে।








