নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক এবং হিংসাত্মক যাবতীয় কার্যকলাপ রুখতে সোচ্চার সচেতন নারী সমাজ। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনাসহ ১৩ দফা দাবিতে শুক্রবার মধ্যরাতে কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।
‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ ব্যানারে এতে অগ্নিমশাল হাতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাক্টিভিস্ট রেহনুমা আহমেদ, সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান, কৃষ্ণকলি, আজমেরী হক বাঁধন, অভিনেত্রী কাজী নওশাবাসহ অনেকে।
এদিন রাত ১০টার পর থেকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নারীরা জড়ো হন। সেখান থেকে ফেস্টুন, ব্যানার ও মশাল জ্বালিয়ে পদযাত্রাটি শুরু হয় ঠিক ১১টা ৫৯ মিনিটে। এরপর তা সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান ও আসাদ গেট হয়ে সংসদ ভবনের সামনে সমাবেত হয়।
পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠানোর অবসান চেয়ে এসময় বক্তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন,“শিক্ষার্থী-জনতার রক্তস্নাত বিপ্লবের ফসল হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন হলো। এতদিন ধরে আমরা পিতৃতান্ত্রিক ও নিপীড়নমূলক যে ক্ষমতা কাঠামো দেখেছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সেই সংস্কৃতি পরিবর্তিত হবে তো?”
এসময় বাঁধন বলেন, নারীদের উপর একের পর এক অন্যায় হয়েই যাচ্ছে। যারা অপরাধের সাথে যুক্ত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার আমরা দেখছি না। এখন এসব বন্ধ হওয়া জরুরী। বিশেষ করে আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে চাইবো, তারা নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নিবে এবং নারীর অধিকার এখানে রক্ষা করা হবে।
সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। পদযাত্রা থেকে যে ১৩ দফা দাবি জানানো হয়েছে, সেগুলো হলো—
১. সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন সহিংসতার সঙ্গে যুক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ও ন্যায্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. সায়েম সোবহান আনভীর, শাফাত আহমেদের মতো শিল্পপতি-ধনকুবেরদের নারী নিপীড়নমূলক অপরাধ বিচারের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যায্যভাবে খারিজ হয়ে যাওয়া মামলাগুলো পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা পুনঃসংস্কার করার মাধ্যমে আইনের দিক সহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে।
৪. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনি ও সামাজিকভাবে ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন সংস্কার করতে হবে।
৫. মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে।
৬. সেনা প্রহরার পাহাড়ে নারীর ওপর সংঘটিত সামরিক-বেসামরিক পুরুষদের যৌন সন্ত্রাসের খবর গণমাধ্যমে আসার অবাধ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নেওয়া ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে পাহাড়ে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৭. হাইকোর্টের নির্দেশনানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮. যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইন চালু করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৯. প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ-ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কনসেন্টের গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে জানানো) যোগ করার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকরী পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
১০. মাদ্রাসার শিশুসহ সব শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
১১. কোনও নারী নিপীড়নের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে গেলে থানা ও আদালতে পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
১২. গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
১৩. ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শিল্পী সায়ানের একটি গানের মাধ্যমে এ পদযাত্রা সমাপ্ত করেন নারীরা। গানটির শিরোনাম ‘মা-বোনেরা সাহস করো’। ২০২০ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল শেকল ভাঙার পদযাত্রা। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো পালিত হলো এটি।







