রাজধানীর বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামের ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল নিচতলায় চা-কফির দোকানের ইলেকট্রিক কেটলি থেকে। লিকেজ থেকে ছড়ানো গ্যাসের কারণে মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় তদন্ত শেষ করেছে ফায়ার সার্ভিসের গঠিত কমিটি। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে তারা। তদন্ত শেষে ফায়ার সার্ভিস এসব তথ্য জানিয়েছে।
আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছিল। এ ছাড়া আরও একাধিক সংস্থা তদন্ত কমিটি করে। কমিটিগুলোর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করে গত সপ্তাহে নিজেদের অধিদপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভবনের নিচ তলায় থাকা ‘চা চুমুক’ কফি শপের ইলেকট্রিক কেটলির শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এর মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। মূলত ভবনে লিকেজ থেকে সৃষ্ট গ্যাস জমে থাকার কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ওই তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে পাওয়া গেছে যে হোটেলে যেখানে বসে মানুষ খাওয়া দাওয়া করতো, সেখানেও রাখা ছিল সিলিন্ডার। ভবনের একটিমাত্র সিঁড়ি, সেটাও স্টোর রুম বানিয়ে রাখা হয়েছিল। সিলিন্ডারসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ভর্তি করে রাখা ছিল সেখানে। এ ছাড়া ভবনের রুফটপও উন্মুক্ত ছিল না। মসজিদের পাশাপাশি অফিসসহ আরও কিছু মালামাল ছিল সেখানে।’
তদন্তে আরও উঠে আসে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যে ধরনের নকশার অনুমোদন দিয়েছিল, সেটা পুরোটাই পাল্টে ওই ভবন নির্মাণ করেন মালিকরা। ২০০৩ এর আইন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস থেকে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো ট্রেনিংই তারা নেননি। মোটকথা, যতগুলো অনিয়ম করা যায় সবগুলো অনিয়ম ওই ভবনে ছিল। ভেন্টিলেশন পর্যন্ত ছিল না ভবনটিতে।
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন: আগুনের প্রাথমিক অবস্থার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ৪-৫ মিনিটের মধ্যে আগুন অতিমাত্রায় জ্বলতে থাকে। বৈদ্যুতিক উৎস থেকে লাগার পর আগুনটা গ্যাসে ছড়িয়েছে। প্রথম পর্যায়ে লোকজন এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জমে থাকা গ্যাসের কারণে তারা ব্যর্থ হন। ৬ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম গাড়ি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, ততক্ষণে নিচতলা আগুনে ব্লক হয়ে যায়।
তিনি বলেন, যদি খালি একটি সিঁড়ি থাকত, তাহলে এত মানুষ মারা যেত না। একটিমাত্র সিঁড়ি রয়েছে, তাও সেটি গ্যাস সিলিন্ডার রেখে ব্লক করে রাখা হয়েছিল। এমন অন্তত ১৩টি ব্যত্যয় ছিল ভবনটিতে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুতর। ভবনে যে সংখ্যক লোক যাতায়াত করে সে তুলনায় অন্তত দুটি সিঁড়ি থাকা আবশ্যক ছিল। ভবনের কাঠামোগত পরিবর্তন করতে গিয়ে আরেকটি ‘গুরুতর ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে’।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়। দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৪৬ জন। এ ছাড়া অন্তত ২২ জন গুরুতর আহত হন। ভবনের নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত অনেক রেস্তোরাঁ, কফি শপ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। বিশেষ করে রেস্তোরাঁর সংখ্যাই ছিল বেশি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রেস্টুরেন্টগুলোতে ভিড় হতো ভোজনপ্রেমীদের। কিন্তু, অগ্নিনির্বাপনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না ভবনটিতে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, এ ধরনের ভবনে কমপক্ষে ৫০ হাজার গ্যালন পানি ধারণক্ষমতার ওয়াটার রিজার্ভার না থাকলে আমরা ছাড়পত্র দিই না। কিন্তু সেখানে পানির ক্যাপাসিটি মাত্র ১০ হাজার গ্যালন। পানি ছিল আরও কম।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ফায়ার সেইফটি প্ল্যান ২০০৩ এবং রাজউক থেকে অনুমোদন করা নকশা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি।








