গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে দেশের সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে। শীর্ষ পদের কেউ স্বেচ্ছায় পদ ছাড়ছেন, কেউ চাপের মুখে সরে যাচ্ছেন, কাউকে করা হচ্ছে ছাঁটাই অথবা দেয়া হচ্ছে বাধ্যতামূলক অবসর। ক্ষমতার পালাবদলের ঢেউ লেগেছে ক্রীড়াঙ্গনেও। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী বিসিবি ছেড়েছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে পদত্যাগের দাবি ওঠা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। যা নিয়ে বাফুফেতে চলছে অস্থিরতা।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাফুফে সভাপতির পদত্যাগের দাবি জোরাল হয়েছে। কাজী সালাউদ্দিন ও ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য-নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের পদত্যাগ চাচ্ছেন সাবেক ফুটবলার-সংগঠক থেকে সাপোর্টার্স ফোরাম সদস্যরা। ৭ দিনের আল্টিমেটামও দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনড় সালাউদ্দিন। ১৬ বছর ধরে সভাপতির পদ আঁকড়ে থাকা সাবেক ফুটবলার এখনও পদত্যাগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেননি। আবারও নির্বাচন করতে চান বলেও গণমাধ্যমে এসেছে।
পদত্যাগ করবেন না, ২৬ অক্টোবর বাফুফে নির্বাচন হবে, তাতে লড়বেন। সালাউদ্দিন এমন জানিয়েছেন, ‘আমি পদত্যাগ করছি না। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। কোন হুমকির মুখে ফুটবল ছাড়ব না। হ্যাঁ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বললে আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখতাম। কিন্তু কোথা থেকে কিছু ছেলে-পেলে আমাকে হুমকি দেবে, এটা মেনে নেয়া যায় না। ওরা বলেছে, আমাকে যেখানে পাবে, সেখানেই নাকি মারবে। এটা তো ওরা বলতে পারে না।’
ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আইন অনুসারে, কোনো দেশের ফুটবল ফেডারেশনে সরকারি বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ অবৈধ। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সালাউদ্দিন যদি নিজে থেকে সরে না যান তবে নির্বাচন ছাড়া তাকে বদলের সুযোগ নেই। সরকারি হস্তক্ষেপে বাফুফে সভাপতিকে সরাতে গেলে ফিফা বাংলাদেশ ফুটবলকে নিষিদ্ধ করতে পারে, এমন শঙ্কা আছে।

সরকার পতনের পর দলীয়করণ এবং রাজনীতির প্রভাবমুক্ত ক্রীড়াঙ্গনের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক, গোলরক্ষক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক। সালাহউদ্দিন কমিটিকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে চলেছেন তিনি।
আমিনুল বলছেন, ‘বাস্তবতা হল সব জায়গায় আওয়ামীকরণ করে রাখা হয়েছে। যার কারণে কাজী সালাউদ্দিন আমাদের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, দুদকে তার নামে যে দুর্নীতির মামলা হয়েছে, যে কর্মকর্তা সেখানে রয়েছেন, তাদের কাছে জোর দাবি করছি সেই মামলা উত্থাপিত করে তাকে আইনের আওতায় এনে তদন্ত করে তার বিচারকার্য সম্পন্ন করার।’
‘আমাদের ফিফার একটি বাধা রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত হয়েছে এই তথ্য ফিফার কাছেও আছে, আইসিসির কাছেও আছে। আমাদের বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, আমরা চাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে যেভাবে ফেডারেশনের নির্বাচন হয়, সেভাবেই হবে। কিন্তু এখানে যেহেতু আওয়ামীপন্থীরা বসে আছে, স্বৈরাচারী কায়দায় যারা চেয়ার দখল করে রেখেছে, তাদেরকে রেখে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন হবে না।’
‘আমরা চাই ক্রীড়া উপদেষ্টার সাথে বসে কথা বলে ফিফার যে নিয়ম আছে, সেই নিয়মকে রক্ষা করে একটি পথ বের করতে। ফুটবল ফেডারেশনের যারা দায়িত্বরত আছেন, তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। পদত্যাগ করে ভবিষ্যতে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে গঠনমূলক নির্বাচন দিয়ে ফুটবল ফেডারেশন সাজাতে পারি, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কার দাবি করে আমিনুল আরও বলেছেন, ‘আমরা চাই বাংলাদেশে এখন থেকে ক্রীড়াঙ্গনের কোনো ফেডারেশনে দলীয়করণ, কোনো সংগঠনে রাজনীতি করা যাবে না। সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত থাকবে। কোনোরকম দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই এবং আমরা চাই যারা ত্যাগী, বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছেন, মাঠে কাজ করেছেন, তাদের দিয়ে আমরা প্রত্যেকটি ফেডারেশন সাজাব। এখানে কোনো বিএনপিও থাকবে না, আওয়ামী লীগও থাকবে না। যারা যোগ্য তারাই থাকবে।’
ক্লাবগুলোর মধ্যেও চলছে অস্থিরতা। যার প্রভাব পড়তে পারে ক্লাবের সঙ্গে জড়িত খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেও। সরকার পতনের দিন বিকেলেই হামলা হয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের তিন ক্লাব ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেড, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব ও ফর্টিস এফসিতে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাহনী ও শেখ জামাল। তাদের সবকিছু লুট হয়েছে, দেয়া হয়েছে আগুন। সরকার পরিবর্তন, ক্লাবে হামলা, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রকে বিগত একযুগের অধিক সময় ধরে পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রতিষ্ঠানের সরে যাওয়ার পর প্রিমিয়ার লিগে সব দলের অংশগ্রহণও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এ মৌসুমে প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে অংশ নেবে না, ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে বাফুফেকে। না খেলার সম্ভাবনা রয়েছে শেখ জামালেরও। আর চট্টগ্রাম আবাহনীকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসা প্রতিষ্ঠান পিছুটান দেয়ায় ক্লাবটির অংশ নেয়াও অনিশ্চিত।
এই তিন ক্লাবের অংশ না নেয়া মানেই শতাধিক ফুটবলারের ক্যারিয়ার অনিশ্চিত হওয়া। এরমাঝে প্রায় অর্ধশত পেশাদার ফুটবলার বাফুফে ভবনে গিয়ে ৭টি দাবি উপস্থাপন করেছেন। পরে তারা বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সাথে দেখা করে আর্জি তুলে ধরেছেন। বাফুফে সভাপতির কাছে ফুটবলাররা যে দাবিগুলো তুলে ধরেছেন, তার অন্যতম ছিল রোববারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার সাথে আলোচনা করা।

খেলোয়াড়দের সাত দফা দাবি এমন- অবিলম্বে ফুটবলারদের দলবদল পেছানো নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দায়সারা লিগ চালানো যাবে না। যে দলগুলো খেলবে না বলছে, সেই দলগুলোয় খেলা নিশ্চিত করা খেলোয়াড়ের দায়ভার কে নেবে? এ বছর বিদেশি ছাড়া লিগ চালাতে হবে। যেসব পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে ক্লাবের স্পন্সর ছিল, তাদের আবার ক্লাবের স্পন্সর করার ব্যবস্থা করতে হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সঙ্গে সব খেলোয়াড়ের একটি সভার ব্যবস্থা করতে হবে।
সেই দাবির পর বাফুফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার গত রোববার যান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার কাছে। তিনি ঘরোয়া ফুটবল নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা অবহিত করেন উপদেষ্টাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্লাবের নাম নিয়েও রয়েছে শঙ্কা, তুলে ধরেছেন ইমরান।
বাফুফে সাধারণ সম্পাদক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আসলে এটা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। খেলোয়াড় ও ক্লাব কর্মকর্তারা আন-অফিসিয়ালি যে কথাগুলো বলেছেন, সেখানে নাম নিয়েই সংশয় ছিল। এরমধ্যে আবার শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে ভাংচুর হয়েছে। সে কারণে নামের প্রসঙ্গটি এসেছে। অনেকে আন-অফিসিয়ালি বলেছে নামটা পরিবর্তন করা যায় কিনা। এটা একটা প্রক্রিয়ার বিষয়। ক্লাবের যে বোর্ড আছে তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নাম পরিবর্তন হতে পারে। সেটা করতে গেলে যে সহযোগিতা দরকার সেটা আমরা করব। তবে শেখ জামাল, শেখ রাসেল এই নাম নিয়ে কোনো সমস্যা নেই বলেও জানিয়েছেন উপদেষ্টা মহোদয়।’
২০২৪-২০২৫ ফুটবল মৌসুমে ‘চ্যালেঞ্জ কাপ’, ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ২০২৪-২৫’, ‘ফেডারেশন কাপ ২০২৪-২৫’, ‘সুপার কাপ’ ও ‘স্বাধীনতা কাপ-২০২৪’ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে শুধু ‘চ্যালেঞ্জ কাপ’, ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ২০২৪-২৫’ ও ‘ফেডারেশন কাপ ২০২৪-২৫’র খেলা আয়োজন করা হবে।

২০২৪-২০২৫ ফুটবল মৌসুমের প্রতিযোগিতাসমূহ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তা কিছুটা পিছিয়ে শুরু করা হবে এবং পরবর্তীতে খেলা শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হবে। তবে চলমান পরিস্থিতি বলছে সালাউদ্দিনের পদত্যাগ বা নতুন করে নির্বাচনের চাপ অব্যাহত ও সেটি ঘিরে বাফুফে তথা দেশের ফুটবলাঙ্গনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি দীর্ঘ হবে।
এরমাঝে ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। বিগত কয়েকবছরে বাফুফে তথা সালাউদ্দিনের কমিটি নানা অনিয়ম ঘিরে একাধিকবার শিরোনামে উঠে এসেছে। ফিফা থেকে মিলেছে শাস্তিও। সালাউদ্দিনের অন্যতম সঙ্গী সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ পড়েছেন ফিফার নিষেধাজ্ঞায়।








