বিরাট কোহলি যখন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন, তাকে নিয়ে চলছিল চুলচেরা বিশ্লেষণ। ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশের বিপক্ষে দিবারাত্রির টেস্টে পেয়েছিলেন সেঞ্চুরি, পরে কেটে যায় দীর্ঘ ১,০১৯ দিন। ব্যাট হাতে যে অনন্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন, সে তুলনায় মোটেও ছন্দে ছিলেন না সময়ের অন্যতম সেরা এ ব্যাটার। সময়টাতে হারিয়েছেন সব ফরম্যাটের অধিনায়কত্বও।
অন্যদিকে, তিন ফরম্যাটেই অধিনায়কত্বের চাপ সামলে রীতিমতো উপভোগ করেছেন পাকিস্তানি ওপেনার বাবর আজম। ব্যাটে ছুটিয়েছেন রানের ফোয়ারা, নিয়মিতই পেয়েছেন শতকের দেখা। ১,২৫৮ দিন ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ব্যাটার ছিলেন কোহলি। গত বছরের এপ্রিলে তাকে টপকে যান বাবর। তখন থেকে বিশ্ব ক্রিকেটে শুরু হয় কোহলি ও বাবরের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা।
বাবর যখন পাকিস্তানের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেন, কোহলি ততদিনে ১৫০টিরও বেশি ওয়ানডে খেলে ফেলেছেন। ভারতীয় তারকার সেঞ্চুরিও ততদিনে ২০টির বেশি। ২০২২ সালে এসে নিজের ৪৭তম ওয়ানডেতে ২ হাজার রানের দেখা পান বাবর। জহির আব্বাস ও কেভিন পিটারসেনের সঙ্গে যৌথভাবে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যা দ্বিতীয় দ্রুততম দুহাজার রানের রেকর্ড। ততদিনে কোহলি রানপাহাড় গড়ে ফেলেছে।
করোনা মহামারিতে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় সবধরনের খেলাধুলাই বন্ধ ছিল। ক্রিকেটও ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২০ সালে ৯ ওয়ানডে খেলা কোহলি ৪৭.৮৮ গড়ে ৫ ফিফটিতে করেছিলেন ৪৩১ রান। ৪৭.৮৮ গড়ে এ রান তুলেছিলেন, যা বেশ দুর্দান্তই বলা চলে। যদিও একদিনের ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ার গড় ৫৭.৬৮। অতি ভালো ক্রিকেটারটি যখন নিজের সেরা পর্যায়ের পারফরম্যান্সের চেয়ে একটু কম রান করেন বা উইকেট নেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয় কানাকানি।
সেই ২০২০ সালেই কোহলির চেয়ে বাবরের গড় ছিল অনেকবেশি। তবে ভুলে গেলে চলবে না, সেবছর তিনটির বেশি ওয়ানডে খেলেনি পাকিস্তান। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছিল সিরিজ। ৩ ম্যাচে একটি করে ফিফটি-সেঞ্চুরিতে ১০১.৮৪ গড়ে পাকিস্তান অধিনায়ক করেছিলেন ২২১ রান। সেঞ্চুরি পাওয়ার বিচারে ভারতের সাবেক অধিনায়কের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও কেবল ৩ ম্যাচ খেলায় বাবরের সঙ্গে তার গড়ের তুলনা চলে আসে, যদিও তা খুব একটা যৌক্তিকও নয়।
কোহলি ২০২১ সালে খেলেন ৩টি ওয়ানডে। ২ ফিফটিতে ৪৩ গড়ে করেন ১২৯ রান। ৬ ওয়ানডে খেলা বাবর এক ফিফটি ও দুই সেঞ্চুরিতে ৬৭.৫০ গড়ে করেন ৪০৫ রান। গত বছর ওয়ানডেতে তুলনামূলক বিচারে তাই বাবরই এগিয়ে ছিলেন।
চলতি বছর ওয়ানডেতে বিবর্ণ কোহলির ব্যাট। ৮ ম্যাচে ২ ফিফটি পেলেও ২১.৮৭ গড়ে করেছেন ১৭৫ রান। বাবরের অবশ্য বছরটা দারুণ কাটছে। ৯ ম্যাচে ৫ হাফসেঞ্চুরি ও ৩ সেঞ্চুরিতে ৮৪.৮৭ গড়ে করেছেন ৬৭৯ রান।
একদিনের ক্রিকেটে ৯২ ম্যাচে ২২ ফিফটি ও ১৭ সেঞ্চুরিসহ ৫৯.৭৯ গড়ে বাবরের মোট রান এখন ৪,৬৬৪। গড়ে কোহলির (৫৭.৬৮) চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও এটা বিবেচনায় নিতে হবে টিম ইন্ডিয়ার সাবেক অধিনায়ক ২৬২ ম্যাচ খেলে গড়ের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। এত সংখ্যক ম্যাচ খেলার পর বাবর তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন কিনা, সেটা সময়ের হাতে তোলা থাকছে। ওয়ানডেতে কোহলির রানসংখ্যা কিন্তু এখন ১২,৩৪৪, ৪৩ শতক সঙ্গী করে।
টেস্টে ২০২০ সাল থেকে এঅবধি কোহলির চেয়ে যোজন এগিয়ে আছেন বাবর। এ সময়ে সাদা পোশাকে কোহলি ১৮ ম্যাচে ৬ ফিফটিসহ ২৭.২৫ গড়ে করেছেন ৮৭২ রান। বিপরীতে ১৭ টেস্টে বাবর ১০ হাফসেঞ্চুরি ও ৩ সেঞ্চুরিসহ ৫৪.৪২ গড়ে ১,৪১৫ রান করে প্রশংসায় ভাসছেন। তাতেই বছরের পর বছর রান করতে থাকা জো রুট ও স্টিভেন স্মিথদের সঙ্গে বাবরের নামটা জুড়ে দেয়ার অবস্থা হয়েছে নানা মতের মুনিদের। ১০২ টেস্টে কোহলির রান কিন্তু ৮ হাজার পেরিয়েছে, ২৮ সেঞ্চুরিতে।
টি-টুয়েন্টিতে ২০২০ সাল থেকে এপর্যন্ত বাবরের মতো ভালোই পারফর্ম করে চলেছেন কোহলিও। ভারতীয় ব্যাটার এ সময়ে ২৯ ম্যাচে ৫০.০৫ গড়ে ১৩৯.২৪ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৯৫১ রান। ৮ ফিফটির পাশাপাশি এই ফরম্যাটেই দীর্ঘ ১,০১৯ দিন পর আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন। এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৬১ বলে ১২২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে ‘দুঃসময়’ থেকে ফিরে আবারও রাজকীয় ফর্মে ফেরার বার্তা দিয়ে রেখেছেন।
এ সময়ে বাবর ৪৩ ম্যাচ খেলে ১৪ ফিফটি ও এক সেঞ্চুরিতে ৩৭.৩৩ গড়ে ১৩০.৪৯ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ১,৩৪৪ রান। অথচ এই সময়ের মধ্যে কোহলিকে দল থেকে ছেঁটে ফেলার কথাও মিনমিন করে হলেও বলেছেন অনেকে।
কোহলির ফুরিয়ে যাওয়ার গল্প লিখতে যারা হাজার হাজার শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাদের মোটেও সমর্থন করছে না পরিসংখ্যান। সেঞ্চুরি খরা এবং মানসিক চাপে থাকায় জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে সরিয়ে রাখাকে যারা তার খারাপ সময়ের চূড়ান্ত অবস্থা বলে দাবি করছিলেন, তাদের উপযুক্ত জবাব এবারের এশিয়া কাপ। অথচ সাম্প্রতিক অফফর্ম বিশ্বকাপ স্কোয়াডেই কোহলির জায়গা পাওয়াকে সংশয়ে ফেলে দিচ্ছিল!
এশিয়া কাপে ভারত ফাইনালে যেতে পারেনি। কিন্তু ৫ ম্যাচে ৯২ গড়ে ২ ফিফটি ও এক সেঞ্চুরিতে ২৭৬ রান করে পুরনো রূপে ফিরেছেন কোহলি। সুসময়ের পর মানুষের জীবনে আসে দুঃসময়। কোহলিও খারাপ সময়ের চক্রে পড়ে হাজার দিনেরও বেশি পাননি সেঞ্চুরির দেখা। দল ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থা থেকে কোহলির এভাবে ফিরে আসা বিশ্বকাপের আগে গোটা ভারতীয় দলের জন্যই হয়ে উঠেছে টনিক।
অন্যদিকে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা বাবর আজম যেন হঠাৎ রানখরায় ভুগতে শুরু করেছেন। এশিয়া কাপে ৬ ম্যাচে ১২.৬০ গড়ে করেছেন কেবল ৬৩ রান। সুপার ফোর পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩০ রানের ইনিংস না খেললে পরিসংখ্যানটা আরও রুগ্নই দেখাত।
লম্বা সময় ধরে নিজের সেরা সময়ে ফিরতে ছটফট করতে থাকা কোহলি ফিরে এসেছেন। ব্যাটে রানের ঝংকার তুলে নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়ে থামিয়েছেন সমালোচকদের মুখ। আর ক্যারিয়ারের সেরা সময় অতিবাহিত করতে থাকা বাবর হঠাৎ করেই যেন এশিয়া কাপে এসে মুদ্রার উল্টোপিঠ দেখছেন। বলা চলে উড়তে উড়তে মাটিতেই নেমে এলেন পাকিস্তান অধিনায়ক।
রোববার রাতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালে মুখোমুখি হবে পাকিস্তান। মাস্টার ক্লাস ব্যাটার বাবর দুঃস্বপ্নের মতো চলতে থাকা আসরের শেষটা ব্যাট হাতে রাঙাতে চাইবেন। ফাইনালের মঞ্চে দুর্দশা কাটানোর সুযোগ তার সামনে। অধিনায়ক হয়ে শিরোপা জিততে তার রান করার বিকল্প নেই, সেটি ভালোই জানেন। চাইবেন গত কবছর যার সাথে তুলনা চলছে, সেই কোহলির মতো দীর্ঘ মলিন যেন না হয় তার ব্যাট। সেটা করতে পারলে মসনদে অনেকদূর এগিয়ে থাকা কোহলির সঙ্গে বাবরের দ্বৈরথটা বিশ্লেষক-সমর্থকদের আলোচনার খোরাক দেবে আরও বহুদিনই।








