ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম রোববার (১ মার্চ) ভোরে খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, শনিবার তার রাজনৈতিক কমপাউন্ডে একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সেমি-অফিশিয়াল তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরানি জনগণকে অবহিত করা যাচ্ছে যে ইসলামিক বিপ্লবের নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ আলী খামেনি শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শহীদ হয়েছেন। খামেনির কন্যা, জামাই এবং নাতি-নাতনি নিহত হয়েছেন বলেও মিডিয়া জানিয়েছে।
ট্রাম্প আগেই বলেছেন, খামেনি ও অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন গোয়েন্দা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে পালাতে পারেননি।
ক্ষমতার উত্থান
খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। খোমেইনি ইসলামিক বিপ্লবের নায়ক হলেও, খামেনি ইরানের সামরিক ও অর্ধসামরিক কাঠামো গড়ে তোলেন যা দেশকে শত্রুদের বিরুদ্ধে রক্ষা করতো এবং সীমান্তের বাইরে প্রভাব বিস্তার করতো।
সুপ্রীম লিডার হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হুসেইনের দিকে ইরানিদের বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা খামেনির পশ্চিমা দেশ ও বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্লেষকরা বলেন, খামেনি তার দীর্ঘকালীন শাসনকাল ধরে রেখেছেন এ ধারণা যে, ইরানকে চিরকাল বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে হবে।
আভ্যন্তরীণ ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা
খামেনির শাসনকালে দেশ অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ২০০৯ সালে অভিযোগযুক্ত নির্বাচনের প্রতিবাদে গণআন্দোলন দমন করা হয়। ২০২২ সালে মহসা আমিনির মৃত্যুর পর নারীর অধিকার নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন শুরু হয়, যা খামেনির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, খামেনি তরুণ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে অনেকটা দূরে ছিলেন, যারা সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নতি চাইছিল। ভ্যালি নাসর বলেন, “ইরানিরা জাতীয় স্বাধীনতার জন্য অনেক মূল্য পরিশোধ করেছে, তবে তারা আর এই স্বাধীনতার বিচক্ষণতায় বিশ্বাস করে না।”
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
খামেনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা একজন প্রখ্যাত মুসলিম নেতা এবং আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত। চার বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে নাজাফ ও কুমের শিয়া শিক্ষালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। কুমে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেইনিসহ অন্যান্য প্রখ্যাত শিক্ষাবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
রাজনৈতিক জীবন ও সুপ্রিম লিডার হওয়া
১৯৭৯ সালের পাহলভী রাজবংশের পতনের পর খামেনি নতুন ইরান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের প্রথম ধর্মীয় রাষ্ট্রপ্রধান হন। ১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যুর পর তিনি সুপ্রিম লিডার নির্বাচিত হন।
খামেনির নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী সামরিক ও অর্ধসামরিক সংগঠন গঠন, যা আইআরজিসি ও বাসিজ-এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হয়।
বিদেশনীতি ও ‘অক্ষ প্রতিরোধ’
খামেনি তার শাসনে পশ্চিমাদের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ২০১৫ সালে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে তিনি হোসেইন রুহানির সঙ্গে জেসিপিওএ পারমাণবিক চুক্তি সমর্থন করেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন পরে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে খামেনি আরও কঠোর অবস্থানে ফিরে যান।
তিনি ইরানের স্বাধিকার ও প্রতিরোধশীল নীতি বজায় রাখার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে মিত্রদের সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যা “অক্ষ প্রতিরোধ” নামে পরিচিত।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
ইরানের মিত্রতা দুর্বল হওয়ার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকে। ২০২৫ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়। খামেনি এই সময়ও ইরানের জনগণকে দেশপ্রেম ও স্বাধিকার রক্ষার জন্য আহ্বান জানান।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি দীর্ঘকাল দেশকে যুদ্ধকালীন মানসিকতা, প্রতিরোধ এবং ধর্মীয়-রাষ্ট্র নীতির মধ্যে পরিচালিত করেছেন। তার মৃত্যুর পর ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ৫টি শহর তেহরান, ইস্পাহান, কোম, কারাজ এবং কেরমানশাহ। যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে। পরবর্তীতে ইরান হামলা চালায় ইসরায়েলে। ইসরায়েল এই হামলাকে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা’ (প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক) বলেছে।
ইসরায়েলের পর বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইরান।








