এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়। অনেকটা বিমর্ষ শুরু হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ মিশন। আসরের শুরুতেই টানা দুই হার। এরপর বাকীটা সবার জানা। টানা সাত জয়ে টেবিলের তিনে থেকে সেমিতে পা রাখা। এর প্রোটিয়াদের হারিয়ে শিরোপার মহারণে হট ফেভারিট ভারতের সঙ্গী হয় তারা। স্বাগতিক দল ও আসরের অপরাজিত হিসেবে শিরোপার দৌঁড়ে এগিয়ে ছিল ভারত। তবে ফাইনাল মহারণে স্বাগতিকদের কাঁদিয়ে সর্বোচ্চ ছয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে অস্ট্রেলিয়া।
এর আগে ১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫ সালে নিজেদের ঘরে বিশ্বকাপের শিরোপা তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে নিজেদের তৃতীয় শিরোপা অর্জন করেছিল তারা। বিশ বছর পর ভারতের মাঠে ভারতকে হারিয়েই নিজেদের হেক্সা শিরোপা অর্জন করেছে প্যাট কামিন্সের দল।
শিরোপার মহারণে দুর্দান্ত ছিল অস্ট্রেলিয়া বোলাররা। ভারতকে অল্প রানেই আটকে দিয়েছিল তারা। ভারতের দেয়া চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জাসপ্রীত বুমরাহ ও মোহাম্মদ শামির আগুন ঝরা বোলিংয়ে শুরুর দিকেই হোঁচট খেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। এরপর মার্নাস লাবুশেনকে নিয়ে মহাকাব্য রচনা করেছেন ট্রাভিস হেড। ১২০ বলে ১৩৭ রানের অনবদ্য জুটি গড়ে অজিদের জয়ের বন্দর থেকে মাত্র ২ রান বাকী থাকতেই ফিরে যান।
এরপর শেষ কাজটুকো সম্পন্ন করেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ৪৩তম ওভারের শেষ বলে দুই রান নিয়ে ৬ উইকেটের জয় নিশ্চিত করেন। ৪২ বল হাতে রেখেই শিরোপা নিজেদের করে নেন প্যাট কামিন্সের দল।

আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে রোববার অস্ট্রেলিয়া টসে জিতে ব্যাটে পাঠায় স্বাগতিক ভারতকে। লোকেশ রাহুল ও বিরাট কোহলির ফিফটিতে নির্ধারিত ওভার শেষে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৪০ রানের সংগ্রহ পায় স্বাগতিক দল। জবাবে নেমে হেডের সেঞ্চুরিতে ৪৩তম ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় অজিরা।
রানতাড়া করতে নেমে ভারতীয় বোলারদের তোপের মুখে নড়বড়ে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ওভারে উইকেট হারায় তারা। দলীয় ১৬ রানে ভারতকে প্রথম সফলতা এনে দেনে মোহাম্মদ শামি। ৩ বলে ৭ রান করে কোহলির ক্যাচ হয়ে ফিরে যান ডেভিড ওয়ার্নার।
পঞ্চম ওভারে দ্বিতীয় আঘাত হানেন জাসপ্রীত বুমরাহ। ১৫ বলে ১৫ রান করা মিচেল মার্শকে ফেরান রাহুলের ক্যাচ বানিয়ে। সপ্তম ওভারের শেষ বলে দলীয় ৪৭ রানে ফের আঘাত হানেন বুমরাহ। স্টিভেন স্মিথকে ফেরান লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে। ৯ বলে ৪ রান করে যান স্মিথ।
২২তম ওভারের দ্বিতীয় বলে কুলদীপ যাদবের ডেলিভারি স্কয়ার অঞ্চলে পাঠিয়ে ফিফটি পূর্ণ করেছেন হেড। ৫৮ বলে ফিফটি ছোঁয়া ইনিংসে ছিল ছয়টি চার ও একটি ছক্কার মার। এরপর চার-ছক্কার মারে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি।

৩৪তম ওভারের পঞ্চম বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ট্রাভিস হেড। ১৪টি চার ও একটি ছক্কায় ৯৫ বলে সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন অজি ওপেনার।
সপ্তম ব্যাটার হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে সেঞ্চুরি করেছেন হেড। অজিদের মধ্যে তৃতীয় ব্যাটার হিসেবে ফাইনালে এমন কীর্তি গড়েছেন তিনি। এর আগে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (১৪৯ রান) ২০০৭ সালে ও রিকি পন্টিং (১৪০* রান) ২০০৩ সালে ফাইনালে সেঞ্চুরি করেন।
এছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ড (১৩৮* রান) ১৯৭৯ সালে, শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার অরভিন্দ ডে সিলভা (১০৭* রান) ১৯৯৬ সালে, ২০১১ বিশ্বকাপে মাহেলা জয়বর্ধন (১০৩* রান) ও ১৯৭৫ সালে ওয়েস্ট কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েড (১০২ রান) বিশ্বকাপের ফাইনালে সেঞ্চুরি করেছিলেন।
অজিদের জয়ের পথে হেডকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন লাবুশেন। ২১৫ বলে ১৯২ রানের দুর্দান্ত জুটি গড়েছেন দুজনে। ৪২.৫ ওভারে হেডকে ফিরলে জুটি ভাঙে। মোহাম্মদ সিরাজের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিড উইকেট অঞ্চলে গিলের হাতে ধরা পড়েন হেড। ১৫টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১২০ বলে ১৩৭ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন অজি ওপেনার।

লাবুশেনও ফিফটি পেয়েছেন। ১১০ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল চারটি চারের মার।
ভারতের হয়ে জাসপ্রীত বুমরাহ দুটি উইকেট নেন। এছাড়া মোহাম্মদ শামি ও সিরাজ নেন একটি করে উইকেট।
এর আগে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে লক্ষাধিক ভারতীয় দর্শকের সামনে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামে স্বাগতিক দল। দর্শকসারিতে দেখা যায় বলিউড তারকাদেরও সরব উপস্থিতি। শতকোটির অধিক মানুষের প্রত্যাশা মেটানোর লড়াইয়ে ভারত পেয়েছিল উড়ন্ত সূচনা। দ্রুত ৩ উইকেট হারিয়ে সতর্ক হয়ে বাকি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে কোহলি-রাহুলদের।
অসাধারণ ফিল্ডিং আর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে স্বাগতিকদের বেশ চাপে রাখে অস্ট্রেলিয়া। ১০ ওভারে ৯ চার, তিন ছয়ে ৮০ রান তোলা ভারতকে ১৬.২ ওভার অপেক্ষা করতে হয় পরের বাউন্ডারি পেতে।
ক্রিজে নেমেই টি-টুয়েন্টি স্টাইলে ব্যাট চালান ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। তারকা ওপেনারের ৩১ বলে ৪৭ রানের ঝড় থামার পর থমকে যায় ভারতও। সময় যত এগোয়, উইকেটও হতে থাকে মন্থর। স্টেডিয়ামের লক্ষাধিক ভারত দর্শককে হতাশ করেন অধিকাংশ ব্যাটার। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতনে গ্যালারির নীল-উৎসব অনেকটাই ‘মাটি’ হয়ে যায়।

নবম ওভারের শেষ বলে শ্রেয়াস আয়ারের বাউন্ডারির পর আরেকটি বাউন্ডারি আসতে পেরিয়ে যায় ৯৮ বল। চাপে পড়ে মন্থর ব্যাটিংয়ে ভারত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে গেছে, তবে সফল হতে দেয়নি অজিবাহিনী। নিয়মিত বিরতিতে তুলে নেয় উইকেট।
৮১ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর রানমেশিন বিরাট কোহলি বেশ কিছুক্ষণ উইকেটে থেকে ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব দেন। লোকেশ রাহুলকে নিয়ে জুটি গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ফিফটির পর প্যাট কামিন্সের বাউন্সারে ব্যাটের ভেতরে লাগিয়ে বোল্ড হন কোহলি। সবচেয়ে দামি উইকেট হারানোর হতাশায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকে গ্যালারি। ভারত চতুর্থ উইকেট হারায় ১৪৮ রানে।
কোহলি ৬৩ বলে ৫৪ রান করেন চারটি চারের সাহায্যে। চাপের মুখে ধীরস্থির থেকে ভারতকে টানছিলেন রাহুল। তার ইনিংসও বড় হয়নি। ফিফটি পেরিয়ে মিশেল স্টার্কের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। ১০৭ বলে মাত্র একটি চারে করেন ৬৬ রান।
স্টার্ক নেন ৩ উইকেট। কামিন্স ও জস হ্যাজেলউড দুটি করে উইকেট নেন। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও অ্যাডাম জাম্পা নেন একটি করে উইকেট।








