দেশে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল সবখানেই নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছেন নারীরা।
আগের তুলনায় সহিংসতার মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সহিংসতায় নতুন নতুন ধরন যুক্ত হচ্ছে। গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী জীবনে কোনো একবার নিকটতম সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও ধর্ষণবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা, ধর্ষণবিরোধী আইন সংস্কার করা, নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অনলাইনে ও অফলাইনে কঠোরভাবে দমন করতে পারলে এ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে আজকের দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদ্যাপন কমিটি ১৯৯৭ সাল থেকে এ দিবস ও পক্ষ পালন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনও নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
জাতিসংঘের এবারের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সাইবার সহিংসতা রোধে ঐক্যবদ্ধ হোন’।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাইবার সহিংসতাসহ নারী ও কন্যার প্রতি সব ধরনের নির্যাতনকে ‘না’ বলুন এবং নারী ও কন্যার অগ্রসরমাণতা নিশ্চিত করুন”—এ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালন করছে।
নারী নির্যাতনের তথ্য পেতে আসছে কিউআরএস ব্যবস্থা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গতবছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২৭টি, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। বেড়েছে ৭৬টিঁ। স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫৫টি। তা বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পেয়ে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি (কিউআরএস) নামে ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে কোনও নারীর ওপর সহিংসতা, কোনও শিশুর ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়া গেলে সেই তথ্য মন্ত্রণালয় পৌঁছাতে হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে, এটাই হবে এই মন্ত্রণালয়ের ভিশন ও লক্ষ্য।
রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ থাকতে হবে
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যে জানা গেছে, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণসহ নানাভাবে গত অক্টোবর মাসে ১০১ জন কন্যা এবং ১৩০ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ৯২ জন কন্যা এবং ১৩২ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আগস্টে ৭৯ জন কন্যা এবং ১৪৪ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই তিন মাসে মোট নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৭৮ জন নারী ও শিশু।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া কেবল আন্দোলনের মাধ্যমে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
পারিবারিক সহিংসতাও বেড়েছে
শুধু ধর্ষণ নয়, পারিবারিক সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন নারী। স্বামীর পরিবারের হাতে নিহত হয়েছেন ৪২ জন এবং নিজ পরিবারের হাতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন নারী। পারিবারিক নির্যাতনে মোট নিহত হয়েছেন ৩২২ জন নারী, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে একজন নারী হত্যার শিকার হচ্ছেন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার ৩৬৩টি ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে।
জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ইভটিজিংসহ নানা কারণে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন ফোন পেয়েছে ২৬ হাজার ৩১৭টি। এর মধ্যে স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে ৯৯৯ এ ফোন এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি। যেখানে গতবছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ৯৯৯ মোট ফোন কল পেয়েছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের বিষয়ে ফোন ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ১০৯-এ চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে ফোন এসেছে ৪৮ হাজার ৭৪৫টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগও জানায়, প্রতিদিনই ভুক্তভোগী নারীরা সাহায্যের জন্য আসছেন এবং বিভাগ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।
সহিংসা নিমূল সম্ভব নয়, নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে এর হার-টাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমাদের দেশে ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে, সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে যে কেউ ভুক্তভোগী হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর থাকলে এমন হয়।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে করণীয় জানতে চাইলে এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন: আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও রয়েছে। ভুক্তভোগী নির্যাতিত হলে বড় আকারে সংবাদ পরিবেশিত হয়। কিন্তু বছর খানেকের মধ্যে আসামির সাজা হলে সেটা তখন সংবাদে খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। আমাদের চলচ্চিত্র, নাটকে খুব সহজে নারী নিপীড়ন দেখানো হয়। যা আমাদের সমাজ সাধারণ ঘটনা মতো হজম করে ফেলেছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে আমাদের উল্টো। তাদের চলচ্চিত্রে নারীকে ‘চড়’ দেওয়াটাও দৃশ্যায়িত করে না।
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইমাম, মুয়াজ্জিন, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী নির্যাতন রোধে শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।


