নির্বাচন কমিশন একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; যাদের নিরপেক্ষতা ও সাহসের ওপর নির্ভর করে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের ৪৬ বছরের ইতিহাসে কি এমন নিরপেক্ষ আর সাহসী নির্বাচন কমিশন কখনো দেশের মানুষ দেখেছে? দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আসলেই দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে পেরেছে এবং সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন করতে পেরেছে? যদি না পেরে থাকে, তাহলে এর কারণ কী? যদি নির্বাচন কমিশন আখেরে সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করে বা করতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই কমিশন সার্চ কমিটির মাধ্যমে এলো নাকি রাষ্ট্রপতি সরাসরি নিয়োগ দিলেন, তাতে কী যায় আসে?
বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং এর আগেই সংবিধান অনুযায়ী অনধিক পাঁচজন কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে, যাদের একজন হবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এবার কমিশনে একজন নারীও থাকছেন, যিনি হবেন দেশের প্রথম নারী নির্বাচন কমিশনার। তাকে আগাম অভিনন্দন।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন প্রণয়নের কথা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে। কিন্তু এত বছরেও এরকম একটি আইন করা হয়নি।
আগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতেন। সেখানে প্রথমবারের মতো ২০১২ সালে সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ইসি নিয়োগ দেয়া হয়। ওই অনুসন্ধান কমিটির প্রধান ছিলেন হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন- যিনি এবারও সার্চ কমিটির প্রধান; তিনি এখন আপিল বিভাগের বিচারপতি।
এবার সার্চ কমিটিতে আরও রয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক যিনি দীর্ঘদিন নির্বাচন কমিশনের সচিব ছিলেন। রয়েছেন মহা হিসাব নিরীক্ষক মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিরীণ আক্তার। অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ড. শিরীণ আক্তার কক্সবাজার মহিলা আওয়ামী লীগের একজন সদস্য।
এরইমধ্যে বিএনপি এই সার্চ কমিটি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এই কমিটিতে যারা আছেন তারা নিরপেক্ষ নন। কেননা কমিটিতে দুজন সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। আরেকজন সদস্য তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সরকার প্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তা হলো, এই সার্চ কমিটি কিংবা নির্বাচন কমিশনের আসলে কী ক্ষমতা? বর্তমান নির্বাচন কমিশনও সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কি নিজেদের ওই অর্থে খুব নিরপেক্ষ এবং দক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছেন? তারা কি বিতর্কের ঊর্দ্ধে থাকতে পেরেছেন?
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নৈতিক মানদণ্ড, তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের জানাশোনা অবশ্যই আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন বারবারই বিতর্কিত হয়েছে। ‘আজিজ মার্কা কমিশন’ বলে একটা প্রবাদও চালু হয়ে গেছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনও দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই একজন কমিশনার সাংবাদিকদের সঙ্গেই বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একজন কমিশনারের আচরণের প্রতিবাদে ইসি বিটের সাংবাদিকরা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ওই কমিশনারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন। দেশের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। অবশেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে ওই কমিশনারের আচরণের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।
সুতরাং সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পেলেই যে ভালো নির্বাচন কমিশন হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে যখন কমিশন গঠিত হয়েছিল,তখন কোনো সার্চ কমিটি হয়নি। অথচ এই হুদা কমিশনকেই দেশের ইতিহাসে অন্যতম সফল এবং তুলনামূলক কম বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন বলা যায়। নির্বাচন কমিশন এবং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারে অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি। সেসব নিয়ে খুব একটা আলোচনাও পরে হয়নি।
আগামী কমিশনের দায়িত্বে যারা আসবেন, তাদের কাছে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আর নিরপেক্ষতাই আশা করবে দেশের মানুষ। কারণ এই কমিশনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার উপরেই নির্ভর করবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে?
যদিও আবারও সেই পুরনো প্রসঙ্গ অর্থাৎ পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অর্থাৎ সরকার যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে না চায়, সেখানে নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। নির্বাচনকে যদি একটি বড় খেলা ধরা হয়, তাহলে সেখানে পক্ষ দুটি। একটি রাজনৈতিক দল এবং আরেকটি ভোটার। নির্বাচন কমিশন এই রাজনৈতিক দল ও ভোটারের খেলায় রেফারি মাত্র। খেলোয়াড়রা ফাউল করলে রেফারি সেখানে লালকার্ড হলুদকার্ড দেখাতে পারেন। চাইলে খেলা বন্ধও করে দিতে পারেন। কিন্তু সরকার হচ্ছে ফিফা বা আইসিসি। খেলা আসলে কেমন হবে, কোন নিয়মে হবে- পাতানো হবে নাকি ফেয়ার হবে- এসবে রেফারি বা আম্পায়রদের ভূমিকা থাকে না বললেই চলে।
নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ হোক, চাইলেও তারা ভালো নির্বাচন করতে পারবে না, যদি মাঠ প্রশাসন তাদের সহায়তা না করে। যদি মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ কর্তৃত্ব না থাকে এবং যদি প্রশাসন নির্বাচনকালীনও সরকারের বা সরকারি দলের নেতাদের কথায় ওঠেবসে, তাহলে খুব ভালো এবং খুব নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।
ভালো নির্বাচন মানে কেবল সহিংসতামুক্ত ভোট নয়। ভালো নির্বাচন মানে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ভালো নির্বাচন মানে ভোটাররা সচ্ছন্দে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে সঠিকভাবে ভোটগণনা হবে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা ভোটের সঠিক ফলাফল ঘোষণা করবেন। সুতরাং ২০১৯ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আক্ষরিক অর্থেই একটি ভালো নির্বাচন হবে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে- এমন চ্যালেঞ্জ নিয়েই চেয়ারে বসতে হবে নতুন নির্বাচন কমিশনকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







