আবুল কাশেম হৃদয়, কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আর সাতদিন। প্রচারণার সপ্তাহখানেক সময় হাতে রেখে ভোটের হিসাব নিকাশ কষতে শুরু করেছেন প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী আনজুম সুলতানা সীমা ও মনিরুল হক সাক্কু। সেই হিসেবে দুই প্রার্থীই এখন মিলে গেছেন এক বিন্দুতে, ঝুঁকছেন দক্ষিণে। শেষ মুহূর্তের প্রচারে দুই প্রার্থীই টার্গেট করেছেন কুমিল্লা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৬০ হাজার ভোটারকে।
গত নির্বাচনের মতো এবারও যারা গড়ে দিতে পারেন মেয়র প্রার্থীর ভাগ্য। সেই পরিসংখ্যান সামনে রেখেই দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ড চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি, দেখাচ্ছেন উন্নয়নের স্বপ্ন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।যার ৯টি ওয়ার্ড সাবেক সদর দক্ষিণ পৌরসভার। আয়তনে উত্তরের চেয়ে বেশি হলেও দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ডে মোট ভোটার আছেন ৬০ হাজার ৬২৯জন। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে সিটি নির্বাচন হওয়ায় ভোটাররা কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ভুগছেন সিদ্ধান্তহীনতায়। সিদ্ধান্তহীন এসব ভোটারদের পক্ষে আনতে প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী আনজুম সুলতানা সীমা ও মনিরুল হক সাক্কু ছুটছেন দক্ষিণের এ ৯ টি ওয়ার্ডে। নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিদিনের তালিকাতেই থাকছে দক্ষিণের কোনো না কোনো ওয়ার্ড। চলছে বিরামহীন প্রচারণা, থাকছে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি।
মঙ্গলবার ঘোষিত আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সীমার নির্বাচনী ইশতেহারেও রয়েছে দক্ষিণের ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রভাব। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, মেয়র নির্বাচিত হলে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন কুসিকের দক্ষিণ কার্যালয়ে অফিস করবেন। এছাড়াও প্রতিদিনের প্রচারণা, গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকেও উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হচ্ছেন ভোটারদের সামনে।
সীমা ছাড়াও সদর দক্ষিণ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। দক্ষিণ উপজেলার ৯টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের ছোট ভাই গোলাম সারওয়ার। আগে থেকেই তিনি নেতাকর্মীদের ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুও জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন সদর দক্ষিণের ৯টি ওয়ার্ডে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনিও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফোটাচ্ছেন।৯টি ওয়ার্ডের এসব ভোটারের প্রভাব নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখবে সেটা সাক্কু ভালো করেই জানেন। গত সিটি নির্বাচনে এই সদর দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর চেয়ে চার হাজার ভোট বেশি পেয়েছিলেন তিনি।
গতবারের মতো এবারও ভোটারদের নিজেদের সমর্থনে আনতে বিরামহীন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটছে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। সব সময় তারা যাচ্ছেন ভোটারদের কাছে, দরজায় কড়া নেড়ে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রার্থীর সালাম, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন সমর্থন আদায়ের।
তবে এবার কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছেন ‘মহানগরীর বাসিন্দা’ পরিচয় পাওয়া প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করা দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ডের ভোটাররা। কণ্ঠে ক্ষোভের ঝাঁজ, আর মনে বঞ্চনার হতাশা। তাদের অভিযোগ, মহানগরের বাসিন্দা হয়েও লোকসানের পাল্লাটাই কেবল ভারী হয়েছে খেটে খাওয়া এসব মানুষদের। উন্নয়নের ছোঁয়া না পেলেও তাদের কাঁধে ঝুলেছে করের বোঝা।
কুমিল্লা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯টি ওয়ার্ডের অন্তত শতাধিক ভোটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে , ১৯ থেকে ২৭নং ওয়ার্ডে বসবাসকারী এসব মানুষরা আর প্রার্থীদের মন ভোলানো কথায় গা ভাসাতে চান না । গাঁয়ে বাস করা ‘নগরবাসী’ চান দৃশ্যমান উন্নয়ন, ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা।
২৫ নং ওয়ার্ডের ছোট ধর্মপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল মমিন জানান, আমরা গ্রামের মানুষ, সামান্য উন্নয়নেই খুশি। কিন্তু সেটাও পাই না। রাস্তাগুলো কেমন সরু, ভাঙ্গাচুড়া। দুইটা অটো যাইতে পারে না, প্রতিদিন দূঘটনা ঘটে। বাড়িতে সারাদিনে পাঁচ ঘন্টাও কারেন্ট পাই না। শহরে উন্নয়ন হচ্ছে হউক, তাই বলে গ্রামের মানুষ কিছুই পাবে না!
‘প্রত্যেক ওয়ার্ডেই তো কাউন্সিলরদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হয়, তাদের কিছু বলেননি?’ এমন কথা শুনে লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবুল বাশার (৫৫) বলেন, বরাদ্দ পাবে কি করে, তারা তো বিএনপি করতো। তবে মেয়র বিএনপির লোক হয়েও শহরে উন্নয়ন করতে পারে, তবে গ্রামে পারবে না কেন।’ তাদের কথায় যেমন যুক্তি আছে, তেমনি আছে ক্ষোভ ,আছে না পাওয়ার হতাশাও।
লক্ষ্মীনগর গ্রামের জহিরুল ইসলাম, ধর্মপুরের মিজানুর রহমান, দয়াপুরের আলী মিয়া, সিদ্দিকুর রহমানসহ আরও অনেকের কথাতেই মিশে থাকলো ক্ষোভ-হতাশা। তারা জানালেন, আমরা কৃষিকাজ করে খাই। অথচ ইপিজেডের গ্যাসযুক্ত ময়লা পানি আমাদের সেই ফসল নষ্ট করে ফেলে। সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়িতে পানি ওঠে। আর ইপিজেডের সেই পানিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় তাদের ঘরের টিন। দুর্গন্ধে বাইরেও বের হওয়া যায় না। এখানে নেই কোনো ডাস্টবিন। সেদিকে কারও কোন খবর নাই। কেবল নির্বাচন আসলে গান গেয়ে গেয়ে প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে যায়। ভোট এবার হিসেব কষেই দেবো। দিন তো আরো কিছু বাকি, দেখা যাক কি হয়।
মেয়র প্রার্থীদের মতো তারাও জানেন ৯ ওয়ার্ডের ৬০ হাজার ভোট গতবারের মতো এবারও গড়ে দিতে পারে যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য, বদলে দিতে পারে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ।








