বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সহজ, নিরাপদ এবং ব্যয় সাশ্রয়ী ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর এক বছর পূর্তি হতে চলেছে। এই এক বছরে দেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মনোপলি ভাঙতে এবং টাকা লেনদেন খরচ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ‘নগদ’। সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সেবাটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর স্বাধীনতা দিবসে (২৬ মার্চ) ‘নগদ’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। যাত্রা শুরুর মাত্র ১০ মাসে ‘নগদ’ দৈনিক ১০০ কোটি টাকা লেনদেন করতে সক্ষম হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গত ১২ জানুয়ারি ‘নগদ’-এর দৈনিক লেনদেন ১০০ কোটি টাকা অতিক্রমের ঘোষণা দেন। এ ধারাবাহিকতায় গত ১৩ মার্চ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান, ‘নগদ’-এ দৈনিক লেনদেন হচ্ছে ১৬০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশে ডাক বিভাগের নিজস্ব অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা অনেক পুরনো। ‘দ্য পোষ্ট অফিস অ্যাক্ট ১৮৯৮’-এর আওতায় অর্থ লেনদেন ‘মানি অর্ডার’ হিসেবে পরিচিত। ‘নগদ’ হলো মানি অর্ডারের ডিজিটাল সংস্করণ। ‘নগদ’ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘নগদ’ দেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল ব্যবস্থায় মনোপলি ভাঙতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সেবা ‘নগদ’-কে জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে থার্ড ওয়েভ টেকনোলোজিস লিমিটেড। এই সেবার আওতায় রয়েছে গ্রাহকের প্রতিদিনের আর্থিক লেনদেন যেমন: ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট, সেন্ড মানি (পি টু পি), পেমেন্ট, মোবাইল রিচার্জ ইত্যাদি। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ‘নগদ’-এ লেনদেনের খরচ সবচেয়ে কম। প্রতি হাজারে ১৪ টাকা ৫০ পয়সা ক্যাশ-আউট চার্জ। আর প্রতি হাজার টাকা ক্যাশ-ইন করলে ৫ টাকা ক্যাশ-ব্যাক সুবিধা দেয় ‘নগদ’। যার ফলে প্রতি হাজারে ক্যাশ-আউট চার্জ গিয়ে দাঁড়ায় ৯ টাকা ৫০ পয়সা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তুলনামূলক বেশি অঙ্কের লেনদেনও করা যায় ‘নগদ’-এ। ছোট ব্যবসায়ীদেরকে এ লেনদেন ব্যবস্থায় আনতে চায় ‘নগদ’। মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা এবং উপবৃত্তির টাকাও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেবে ‘নগদ’। সরকার বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পেছনে খরচ করে, এই অর্থের পুরোটা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে পরিশোধ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অনুশাসন জারি করেছেন।
তারা বলেছেন, গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারও করছে ‘নগদ’। বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বেশ পুরনো হলেও ‘নগদ’ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (ডিএফএস) হিসেবে প্রথম ডিজিটাল কেওয়াইসি পদ্ধতি চালু করে। জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্ট মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে ঘরে বসেই ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নির্বাচন কমিশনের জাতীয় ডাটাবেজের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়। ফলে একটি এনআইডি দিয়ে একের বেশি ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ নেই। একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, যার অর্থ জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ করেছে ‘নগদ’। ‘নগদ’ এ পদ্ধতি চালু করার পর অন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানও এই প্রক্রিয়া চালু করে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘নগদ’ এমন ব্যবস্থা (সেন্ড মানি টু অ্যানি ফোন) চালু করেছে যে কারো ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট না থাকলেও তার মোবাইলেও টাকা পাঠানো যাবে। টাকা পাওয়ার পর অ্যাকাউন্ট খুলে কাছের কোনো উদ্যোক্তার কাছে গিয়ে টাকা তুলতে পারবেন গ্রাহক। এ সেবা শুধু ‘নগদ’ই দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের রয়েছে প্রায় শতবর্ষব্যাপী ব্যাংকিং সেবা প্রদানের সুদীর্ঘ ইতিহাস। দেশজুড়ে ডাক বিভাগের রয়েছে ৯,৮৮৬টি শাখা। আর এসব শাখা থেকে ৪০ হাজারের বেশি কর্মী নিয়মিতভাবে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগ আধুনিকায়নে পিছিয়ে নেই মোটেই।

২০১০ সালে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং সেবা আর্থিক অন্তর্ভূক্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে প্রায় ৬ কোটি ৭২ লাখ গ্রাহক কোনো না কোনোভাবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা গ্রহণ করছেন। তবে কিছুটা হতাশার বিষয় হচ্ছে এই গ্রাহকদের মাঝে কেবল ৩ কোটি ৩৪ লক্ষ গ্রাহক নিয়মিতভাবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা নিচ্ছেন। নিয়মিত ও অনিয়মিত গ্রাহকের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই এখন পর্যন্ত রয়ে গেছেন আর্থিক অন্তর্ভূক্তির বাইরে। এই অবস্থায় আর্থিক অন্তর্ভূক্তিতে ডাক বিভাগ সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সারা দেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে -এর রয়েছে দেড় লাখেরও বেশি উদ্যোক্তা। অন্যদের তুলনায় আচরণগত পরিবর্তন আনায় এ দেড় লাখ উদ্যোক্তা দেশ জুড়ে ‘নগদ’-কে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আরেকটি সফল দিক হলো, কার্যক্রম শুরুর মাত্র এক বছরের মধ্যে ‘নগদ’-এর গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) রিপোর্টিং সংস্থা হিসেবে ‘নগদ’ নিবন্ধিত। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সকল মোবাইল লেনদেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে সকলের লেনদেন ব্যবস্থায় নজরদারি করার জন্য অনুমতি চেয়েছিল। ‘নগদ’ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশের সব মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে চায় ‘নগদ’। এ জন্য ‘নগদ’ সব সময় তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা হালনাগাদ করছে। স্বচ্ছতা ও সেবার মান বাড়াচ্ছে। মোবাইল ফোন অপারেটর রবির সঙ্গে ‘নগদ’-এর চুক্তি হয়েছে। এর ফলে রবির ৫ কোটি গ্রাহক ‘নগদ’ গ্রাহক হবেন। আগামী এপ্রিলের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হবে।








