বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে খ্যাত মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ৯০ বছরের পুরনো এই উৎসবের চলমান ৪৭তম আসরে ভূয়সী প্রশংসা পেল বাংলাদেশি ছবি ‘মাস্তুল’।
মঙ্গলবার মস্কোতে হয়েছে ‘মাস্তুল’ এর বিশ্ব প্রিমিয়ার। যেখানে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ফিল্ম ক্রিটিক থেকে সাধারণ দর্শকরা উপস্থিত ছিলেন। মাস্তুল- এর এই বিশ্ব প্রিমিয়ারে দর্শক সারিতে ছিলেন সিনেমার নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান, চিত্রগ্রাহক আরিফুজ্জামান এবং ‘মাস্তুল’ প্রধান দুই অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু ও দীপক সুমন।
সিনেমাটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে টিম মাস্তুলকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে দেন দর্শকরা। পরে সিনেমাটির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে চান ফিল্ম ক্রিটিক থেকে সমঝদার দর্শকরাও।
মস্কোর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে টানা কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত যাচ্ছে বাংলাদেশি সিনেমা। এরমধ্যে আদিমসহ পুরস্কৃত হয়েছে নির্বাণ নামের একটি ছবিও।
তবে টিম মাস্তুলের সদস্যরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে মস্কোর দর্শকদের কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন, তারচেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না! দর্শক ও ফিল্ম ক্রিটিকদের কাছ থেকে এমন ভালোবাসায় মুগ্ধ ছবির প্রধান দুই অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু এবং দীপক সুমন।

নিজের অভিনীত ছবি নিয়ে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত হতে পারায় ‘ভাগ্যবান’ বলে মন্তব্য করে বাবু বলেন, মস্কোর মতো এতো বড় উৎসবে হাজির হতে পারা যে কারো জন্যই সৌভাগ্যের, আমি নিজের অভিনীত কাজ দিয়ে এই উৎসবে হাজির হতে পারায় সৌভাগ্যবান মনে করছি। এই ছবিতে সুযোগ পাওয়াকেও আমি সৌভাগ্যের মনে করি।
গুণী এই অভিনেতা আরো বলেন, মস্কোর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে ঠাঁই করে নেয়া শুধু মাস্তুল টিমের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশ এবং স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রকর্মীদের জন্য বিশেষ গর্বের।

অভিনেতা দীপক সুমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, মাস্তুল-এর বদৌলতে মস্কোতে আসা আমার জন্য বিশেষ গর্বের। ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে দর্শকের যে প্রতিক্রিয়া দেখেছি, সেটা আমার জন্য অভাবনীয়।
তিনি বলেন, দর্শক এতো নিখুঁতভাবে সবকিছু অবজার্ভ করেছেন, সেটা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। একজন ভিনদেশি দর্শকতো আমাকে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন যে, ‘আমি সত্যি সত্যি জাহাজে জব করি কিনা!’ দর্শক এবং ক্রিটিকদের এমন ভাবনা নিসন্দেহে আমার জন্য বড় প্রাপ্তির।

চিত্রগ্রাহক আরিফুজ্জামানও দর্শকের নিখুঁত পর্যবেক্ষণ দেখে রীতিমত বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মস্কোতে এসে একটা জিনিস দেখেছি, সবাই অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখেন। আমাদের ‘মাস্তুল’ ছবিটি সিনেবোদ্ধা থেকে সাধারণ দর্শক এতো মনোযোগ দিয়ে দেখবেন, সেটা ‘মিট দ্য প্রেস’-এ জার্নালিস্ট এবং ক্রিটিকদের প্রশ্নে টের পেয়েছি। সবাই সিনেমাটির এতো খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করছিলেন, এটাতে আমি এচিভমেন্ট বলেই মনে করি।
২১ এপ্রিল মস্কোতে পা রাখার পর থেকেই উৎসব আয়োজকদের ‘মিট দ্য প্রেস’ কিংবা টিভি সাক্ষাৎকার থেকে উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের মুখোমুখি- এবং পরে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেয়ার কাজটি একাগ্রতার সাথে করে যাচ্ছেন নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। এরআগে এই উৎসবে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন ‘আদিম’ নিয়ে- যে ছবির সহপ্রযোজক ছিলেন তিনি। কিন্তু এবার গেছেন নিজের নির্মিত সিনেমা নিয়ে। অভিজ্ঞতাও তাই ভিন্ন।
নূরুজ্জামান বলেন, আমার সবচেয়ে যে বিষয়টি তৃপ্তির লেগেছে, সেটা হলো উৎসবের প্রজেকশন সিস্টেম! এতো দারুণ স্ক্রিন, এতো বিশাল- সেই সাথে সাউন্ডসহ টেকনিক্যাল সব বিষয়ে ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছি ‘মাস্তুল’-এর প্রিমিয়ারে। দীর্ঘদিন দক্ষিণ ভারতে থেকে এই সিনেমার সাউন্ডের কাজ করেছি, মস্কোতে ‘মাস্তুল’-এর প্রিমিয়ারে সাউন্ডের যে ডেলিভারি দেখেছি, মনে হয়েছে পরিশ্রম সার্থক!
মস্কোতে ‘মাস্তুল’-এর প্রিমিয়ারে শুধু ভিনদেশি দর্শকই নয়, উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী বাঙালিদের অনেকে। তারা সিনেমাটি দেখে বলেছেন- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মানবিক আবেগ ও বাস্তবতাকে ছুঁয়ে যাওয়া এই সিনেমা মস্কোর দর্শকদের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
মস্কোর সমালোচকরা ‘মাস্তুল’-এর গল্প, নির্মাণশৈলী ও অভিনয়কে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। অনেক দর্শকই মন্তব্য করেছেন, সিনেমাটি শুধু একটি দেশের গল্প নয়—এটি একটি সার্বজনীন মানবিক ভাষা, যা যেকোনো সংস্কৃতির মানুষকেই নাড়া দিতে সক্ষম।

সিনেমার চিত্রগ্রহণ, আবহসংগীত ও সংলাপ মস্কোর চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মন জয় করে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। এই অর্জন শুধু ‘মাস্তুল’ সিনেমার নয়, বরং এটি পুরো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক গৌরবময় মুহূর্ত।
মস্কোর এই উচ্ছ্বসিত সাড়া প্রমাণ করে, ভালো গল্প এবং দক্ষ নির্মাণশৈলী থাকলে ভাষা বা ভৌগোলিক সীমা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ‘মাস্তুল’ সেই সীমা অতিক্রম করে এখন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরছে।

নির্মাতা জানিয়েছেন, পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার পর্দা নামছে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবের। আর এদিন স্থানীয় সময় রাতে রয়েছে ‘মাস্তুল’-এর আরো একটি প্রদর্শনী। সব ঠিক থাকলে আগামি ২৬ এপ্রিল ঢাকায় ফিরবে টিম মাস্তুল।








