বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাত ও বড় ব্যাংকগুলো থেকে গত কয়েক মাসে ধারাবাহিক ছাঁটাইয়ের খবর আসছে। সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতেও কর্মীসংকোচনের প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্যয় কমানো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশলই এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ। এতে চাকরিজীবীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি ওরাকল সম্প্রতি প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে ইমেইলের মাধ্যমে ছাঁটাই করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে। প্রযুক্তি খাতে এটি সাম্প্রতিক সময়ের বড় ছাঁটাইয়ের একটি উদাহরণ। কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডেল প্রায় ১১ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়া ও ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের মেটাভার্স প্রকল্প থেকে আরও ৭০০ কর্মী সরিয়ে দিয়েছে। সিইও মার্ক জাকারবার্গ আগেই ব্যয়সংকোচন ও ‘কার্যকারিতা বৃদ্ধি’র ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছিলেন। খাতসংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ছাঁটাইয়ের প্রভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটি ডিজিটাল রূপান্তর, অটোমেশন এবং ব্যয়সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মীসংখ্যা কমানোর পথে হাঁটছে।
ব্যবসা-বিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস এক প্রতিবেদনে বলেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৩ শতাংশ কাজ কমবেশি এআই দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব। যদিও পুরোপুরি মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং আংশিক বা সহায়ক ভূমিকা হিসেবে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে বেতন বৃদ্ধির হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভরতার প্রসারও এর একটি কারণ।
কেন বাড়ছে ছাঁটাই
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার বৃদ্ধি, প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাস, সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমানোর পথে হাঁটছে। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও অটোমেশন প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে একজন কর্মীর বেতন, ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়ের তুলনায় উন্নত এআই সিস্টেমে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক। কারণ, এআইভিত্তিক সিস্টেম দ্রুতগতিতে, নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং তুলনামূলক কম ত্রুটিতে কাজ করতে পারে।
তবে শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এআই পুরোপুরি মানুষের বিকল্প নয়। বরং কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। নতুন দক্ষতা, বিশেষ করে ডেটা বিশ্লেষণ, এআই ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা ও সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের মতো ক্ষেত্রগুলোতে চাহিদা বাড়ছে।
টেক দুনিয়া এখন এক বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মীদের জন্য বার্তা স্পষ্ট- দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আপাতত প্রযুক্তি খাতের এই পুনর্গঠন বিশ্ব শ্রমবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।







