বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে কৃষি বরাবরই একটি শক্তিশালী ট্রাম্পকার্ড। তবে আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সনাতন কৃষি ভাবনার বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি এবং সমুদ্র অর্থনীতির (সুনীল অর্থনীতি) ওপর অভূতপূর্ব জোর দিয়েছে। দলটির ঘোষিত ইশতেহারে একদিকে যেমন তাৎক্ষণিক জনতুষ্টির অংশ হিসেবে ঋণ মওকুফের ঘোষণা রয়েছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যে ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ ও ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ গঠনের মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
কৃষিকে দেশের ‘জীবনরেখা’ হিসেবে অভিহিত করে বিএনপি তাদের ইশতেহারে জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং কৃষককে ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা।
কৃষক কার্ড ও আর্থিক সুরক্ষা:
মূল্যস্ফীতি ও কৃষি উপকরণের উর্ধ্বগতির জাঁতাকলে পিষ্ট কৃষকদের জন্য বিএনপি ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। এই কার্ডটি হবে মূলত একটি ‘স্মার্ট সলিউশন’, যার মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, ভর্তুকি এবং সরকারি প্রণোদনা পাবেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণাটি হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদসহ মওকুফ। দলটির দাবি, বিগত শাসনামলে কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পাননি। এই সংকট কাটাতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে তারা এই ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া, এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্র ঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধ করার একটি বড় ঘোষণা এসেছে, যা নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর থেকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতে পারে।
প্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সনাতন চাষাবাদের ইতি?
বিএনপির ইশতেহারে কৃষির আধুনিকায়নে ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’-এর অনুষঙ্গগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ অভিনব। তারা বলছে, উৎপাদন খরচ কমাতে এবং আয় বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন, রিমোট সেন্সিং এবং ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা হবে।
‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে মাটির গুণাগুণ বিচার করে সার ও বীজের ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। পাশাপাশি তরুণদের কৃষিমুখী করতে ‘এগ্রোপ্রেনারশীপ’ স্টার্ট-আপ প্রকল্প এবং উত্তরাঞ্চলে বিশেষায়িত কৃষি পণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
পানি ব্যবস্থাপনা ও জিয়াউর রহমানের লিগ্যাসি
বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অন্যতম জনপ্রিয় কর্মসূচি ‘খাল খনন’-কে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র আওতায় ২০,০০০ কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দলটির দাবি, এর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী ও হাজারো খালের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনীল অর্থনীতি: জিডিপির নতুন দিগন্ত
ইশতেহারে ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়নের পরবর্তী বড় চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্র সীমানা জয়ের পর সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি।
এই খাতের মূল পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- জ্বালানি নিরাপত্তা: গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব বাড়ানো।
- মৎস্য আহরণ ও সুরক্ষা: আধুনিক ট্রলার ও প্রযুক্তির সহায়তায় গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ এবং ‘লুণ্ঠন প্রতিরোধে’ নজরদারি জোরদার করা।
- কর্মসংস্থান: উপকূলীয় এলাকায় ইকো-ট্যুরিজম এবং সামুদ্রিক শিল্প গড়ে তুলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি।
- পরিবেশবান্ধব শিপ ব্রেকিং: জাহাজ ভাঙা শিল্পকে হংকং কনভেনশন অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব করা এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে রপ্তানি বাড়ানো।
সমুদ্র সম্পদ আহরণে ‘জাস্ট ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্ক’ বা ন্যায়সংগত রূপান্তর নীতি গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে, যাতে উপকূলীয় জনগণের জীবিকা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নিরাপদ খাদ্য ও কঠোর মনিটরিং
খাদ্য ভেজাল রোধে বিএনপি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। একটি শক্তিশালী ‘খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যারা খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং খাদ্য আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ: পুরনো প্রথার বিলোপ
মৎস্য খাতে দীর্ঘদিনের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে ‘জাল যার জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এটি প্রান্তিক জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবি। এছাড়া চিংড়িকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পে ‘ভ্যাক্সিন প্ল্যান্ট’ স্থাপনের মতো কারিগরি সহায়তার কথাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
বিএনপির এই ইশতেহারটি গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে এসে ডাটা-ড্রিভেন বা তথ্য-উপাত্ত নির্ভর অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ এবং এনজিওর কিস্তি পরিশোধের ঘোষণাটি ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, সুনীল অর্থনীতি ও প্রিসিশন এগ্রিকালচারের মতো বিষয়গুলো দলটির আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তবে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ, বিশেষ করে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং উচ্চ প্রযুক্তির কৃষি ব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করাই হতে পারে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








