প্রায় তিন বছর ধরে দেশের সেন্সরের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমাটি। ‘চলচ্চিত্রটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে’ –এমন আশঙ্কায় মুক্তি আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড।
বোর্ডের এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে সেই সময়েই আপিল করে চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া। আপিলের পর ছাড়পত্রের বিষয়ে দীর্ঘ দিনেও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি সেন্সর বোর্ড। সম্প্রতি ‘শনিবার বিকেল’ মুক্তি দিতে সরব হয়েছেন দেশের নির্মাতা, অভিনেতা ও কলাকুশলীরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সপ্তাহ খানেক ধরে ‘শনিবার বিকেল’ এর ছাড়পত্র দিতে সেন্সর বোর্ডের উদ্দেশ্যে অনুরোধ জানাচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকায় সমালোচনার পাশাপাশি প্রতিবাদও করছেন অনেকে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলেন কিংবদন্তী অভিনেতা আফজাল হোসেন।
মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক পাতায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটি স্থিরচিত্র শেয়ার করে পোস্টে সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকা ‘শনিবার বিকেল’ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।
আফজাল হোসেন বলেন, ফারুকীর চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকেল’ অনেকদিন ধরে আটকা পড়ে আছে। শিল্পের বেলায় আটক শব্দটা খুব বিচ্ছিরি ঠেকে। শিল্পী আঁকবার সময়, লিখতে বসে লেখক বা চিত্রনির্মাণের আগে যদি নির্মাতাকে আটকানো মানুষদের চেহারা ভেবে নিতে হয়- তা দুর্ভাগ্য ও দূর্ভোগের।
দিলীপ কুমারের একটি ছবির সেন্সর জটিলতার প্রসঙ্গ টেনে আফজাল হোসেন এসময় আরও বলেন,“ফারুকীর মন ভালো নেই। অভিনেতা দিলীপ কুমারেরও একদা মনখারাপ হয়েছিল। সে শোনা গল্পটা বলি। দিলীপ কুমার গঙ্গা যমুনা বানিয়েছেলেন ১৯৬১ সনে। এটিই তাঁর প্রথম প্রযোজিত ছবি। নিজের লেখা কাহিনী, নীতিন বোসের সাথে যৌথভাবে পরিচালনাও করেছিলেন। ‘গঙ্গা যমুনা’ দুই ভাইয়ের গল্প। দুজনের একজন, গঙ্গা- ছিল ডাকাত। ডাকাত চরিত্রটির ভাষা শুনে তখনকার ভারতীয় সেন্সর বোর্ড বেঁকে বসে। তারা ভেবেছিলেন এ ছবি মুক্তি পেলে হিন্দী ভাষার মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। দিলীপ কুমার তখন মহাতারকা । তাতে কী, বেচারা বনে গেলেন সিনেমা প্রযোজনা করে। কয়েক মাস ধরে শত প্রকার চেষ্টা সত্বেও কোনও লাভ হচ্ছে না বুঝে যোগাযোগ করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রীর কন্যা। সে পরিচয় ছাড়াও নিজের আলাদা একটা অস্তিত্ব তখন গড়ে তুলেছেন। তার সাথে দেখা ও আলাপ আলোচনায় কাজ হয়। মুক্তির পর থেকে আজ অবধি ভারতীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় ‘গঙ্গা যমুনা’ বিশেষ হয়ে আছে। হিন্দী ভাষার কোন ক্ষতি এ চলচ্চিত্রের দ্বারা ঘটেনি।”
ফারুকী সম্পর্কে এই প্রবীণ অভিনেতা আরও লেখেন,‘মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অত্যন্ত প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিরাট পৃথিবীর চলচ্চিত্র উঠোনে তার চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহ তৈরী হয়েছে। এমন অর্জনের জন্য বিশেষ যোগ্যতা থাকতে হয়। এই বিশেষ যোগ্যতা তরুণ প্রজন্মের অনেকের রয়েছে বলে বাংলাদেশের নাম বহু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সগৌরবে উচ্চারিত হয়।’
আফজাল হোসেন বলেন, ‘জগতে স্বপ্ন দেখার মানুষ আছে, আছে দুঃস্বপ্ন দেখা, দেখানোর মানুষও। যে মানুষ স্বপ্ন দেখে- দেখতে চায়, দেখা উপভোগ করে বলে দেখতে পায়। ভয়, দুশ্চিন্তায় কাটানো মানুষের দিন ও রাত দুঃস্বপ্নে কাটবারই কথা। সৃষ্টিকর্তাকে খুব কৌতুকপ্রিয় মনে হয়। দুনিয়ার সকলের মধ্যে তিনি স্বপ্ন দেখবার সাধ্য দিতে পারতেন। দেননি। দাবার ছকের মতো সাদা কালোকে মুখোমুখি রেখেছেন। তবে স্বান্তনা ও আনন্দের কথা এই- কোনও সৃজনশীল মানুষ দ্বারা কখনোই মানুষের অনিষ্ট ঘটাননি। সৃজন দ্বারা চিরকালই মানুষের উপকার হয়েছে।’
দেশে মুক্তির অনুমতি না পেলেও ‘শনিবার বিকেল’ ইতোমধ্যে মিউনিখ, মস্কো, সিডনি, বুসান, প্যারিসের ভেসুল ফিল্ম ফেস্টিভালসহ বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়েছে। এরমধ্যে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে ছবিটি দুটি ইন্ডিপেনডেন্ট জুরি পুরস্কার অর্জন করে।
জাজ মাল্টিমিডিয়া, ছবিয়াল ও ট্যানডেম প্রোডাকশন প্রযোজিত ‘শনিবার বিকেল’ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ১২টি দেশের স্বনামধন্য অভিনেতারা। যার মধ্যে আছেন ফিলিস্তিনের অভিনেতা ইয়াদ হুরানি, ইউরোপের এলি পুসো, সেলিনা ব্ল্যাক, বাংলাদেশি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা, জাহিদ হাসান, মামুনুর রশীদ এবং ভারতের অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।







