হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর এবার বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রুট বাব এল-মান্দেব প্রণালীকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র ২০ মাইল প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথ সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, যা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান করিডর।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালীর এক পাশে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের অবস্থান থাকায় তেহরান চাইলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এই পথটি বন্ধ করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে হুথি পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে—তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করা হবে। হুথি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আবেদ আল-থাওর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিমানবাহী রণতরী তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের প্রতিবাদে হুথিরা লোহিত সাগরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ তেল পরিবহন এবং ২০ শতাংশ কন্টেইনার জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। বর্তমানে চলমান সংঘাত প্রায় তিন সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় নতুন করে কোনো অবরোধ সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি তীব্র হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছে সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এড়াতে দেশটি ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু টার্মিনাল দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। চলতি মার্চে এই পথে রেকর্ড ৫৯ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, যা শিগগিরই ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে হুথিরা পুনরায় হামলা শুরু করলে এই বিকল্প পথও অনিরাপদ হয়ে পড়বে। তখন জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল ঘুরে যেতে হবে এবং মিশরের সুমেদ পাইপলাইন ব্যবহার করতে হবে, যা ব্যয় ও সময়—দুই দিক থেকেই চাপ বাড়াবে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ইরান ও হুথিদের হাতে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত হুথিদের সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানো নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, তারা ইরানের ঘনিষ্ঠ হলেও নিজস্ব কৌশল ও আঞ্চলিক লক্ষ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতির পর তাদের অস্ত্র মজুদ কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে।
এদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের সংঘাতে না জড়াতে সতর্ক করেছে এবং তাদের নেতৃত্বের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে বাব এল-মান্দেব প্রণালী ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।








