বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) ছিলো বিজয়া দশমী। এদিন অভিনেতা ইয়াশ রোহান কপালে সিঁদুর তিলক কেটে দুর্গা মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন। ছবিটি পোস্ট করার পর থেকেই তার মন্তব্য বাক্স ভরে যায় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ায়— যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ঘৃণামূলক এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক।
রাত ১টার দিকে ছবি পোস্ট করার পর মাত্র ১৮ ঘণ্টায় তাতে এসেছে প্রায় ৭১ হাজার রিয়েকশন, আড়াই হাজার শেয়ার এবং ১৫ হাজারের বেশি মন্তব্য। আশ্চর্যের বিষয়, মন্তব্যগুলোর বড় অংশই ছিল কটূক্তি, ধর্মীয় আক্রমণ ও ঘৃণামূলক বক্তব্যে ভরা।
কেউ লিখেছেন,“আজকে থেকে তোমার নাটক আর দেখবো না।” অন্য আরেকজন লিখেছেন “তোকে মুসলিম ভেবেছিলাম।” অপর আরেকজন লিখেছেন,“তুই হিন্দু, আজকে জানলাম।”
এমন অসংখ্য বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য সত্ত্বেও, ইয়াশ রোহানকে ইতিবাচক ও ভদ্রভাবে উত্তর দিতে দেখা গেছে।
তবে নেতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি অসংখ্য ভক্ত তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ লিখেছেন,“আমি ধর্ম দেখে নাটক দেখি না, অভিনেতাকে ভালো লাগলেই দেখি।” আরেকজন লিখেছেন,“ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করা বোকামি। উনি একজন অসাধারণ শিল্পী।”
নেতিবাচক সব মন্তব্য দেখে অনেককে আশঙ্কা প্রকাশও করতে দেখা গেছে। একজন লিখেছেন,“এই কমেন্ট সেকশন দেখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছি।” অন্য আরেকজন লিখেন, “মানুষকে তার কর্ম ও নৈতিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত, ধর্ম দিয়ে নয়।”
শুধু ভক্তরাই নয়, দেশের শোবিজ তারকারাও ইয়াশ রোহানের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
সময়ের তারকা অভিনেতা মুস্তাফিজ নূর ইমরান ইয়াশের ছবিটি শেয়ার করে লিখেন, “ইয়াশ রোহান আমার ভাই। আমার বন্ধু। একজন সম্মানিত শিল্পী। আমি ক্ষমা চাই তার কাছে। শুধু এই ছবিতে মন্তব্যকারীরা নয়, এই দূষিত মানসিকতার প্রতি ঘৃণা জানাই।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে এসময় তিনি আরো লিখেন,“সুশিক্ষা,শিল্প,সংস্কৃতি, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক এবং পর্যটন চর্চার অভাবে একটি জাতি কীভাবে বেয়াদব এবং অসভ্যে পরিণত হতে পারে সেটাই দেখছি দীর্ঘদিন ধরে। যারা এভাবে বলছে, তারা কোনোভাবেই মুসলমানতো হতে পারেইনা আর মানুষ তো অবশ্যই না। সুশাসন, ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং পারস্পরিক সম্মান চর্চার অভাবে আজ আমরা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছি। শক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা যদি অ্যাসোসিয়েশন থেকে নেওয়া হয় এবং এই অসভ্যরা শাস্তির আওতায় আসে তাহলেই ধীরে ধীরে এটা কমতে পারে। সবচেয়ে বড় দুঃখ যারাই দায়িত্বে আসুক কেউই জাতিকে সভ্য করার প্রয়াস করেনি। বরং প্রত্যেকে তার সাধ্যমত ধ্বংস করেছেন।”
ঘৃণা ছড়ানো মন্তব্যকারীদের উদ্দেশে অভিনেতা সোহেল রানা মন্ডল লিখেন, “আবার এরা চায় আর্টিস্ট যেন সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকে… হা হাহা হা। শুভ বিজয়া ভাই আমার ইয়াশ রোহান।”
ক্ষুব্দ প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ তারকা অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীও। ফেসবুকে কারো নাম না নিলেও অন্তর্জালে যারা ঘৃণা ছড়ান, তাদের উদ্দেশে এই তারকা অভিনেত্রী লিখেছেন,“কারও পোস্টে বাজে মন্তব্য করা, স্ল্যাং ব্যবহার করা, অথবা ভুয়া প্রোফাইল দিয়ে কথা বলা আপনাকে সাহসী করে তোলে না। বরং এটা আপনার নীচ মানসিকতাকে প্রকাশ করে এবং আপনি আসলে কেমন মানুষ সেটাই দেখায়। এত ঘৃণা আর অপরাধবোধ নিয়ে কীভাবে রাতে ঘুমাতে যান?”
অভিনেতা আরশ খান লিখেছেন,“ইয়াশ রোহান বাংলাদেশের অন্যতম অভিনেতাদের একজন। যার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব উভয়ই আমার প্রিয়। অভিনেতা ইয়াশকে তার ধর্ম বা সে কোন অঞ্চলের মানুষ তা রিপ্রেজেন্ট করেনা বরং নিজের শৈল্পিক গুণাবলী দিয়ে সে এদেশের মানুষকে, বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেন। ধর্ম যার যার দেশ সবার।”
মানুষকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হয়- ইয়াশ রোহানের একটি ছবি থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক সমাজের এক অন্ধকার দিককে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন নেটিজেনদের সচেতন একটি অংশ। তবে তারা সঙ্গে এটিও বলছেন, নেচিবাচকতার পাশাপাশি অনেক ভক্ত ও সহকর্মীর সমর্থন প্রমাণ করেছে যে শিল্পীকে তার প্রতিভা ও মানবিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই সঠিক পথ।
গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘স্বপ্নজাল’ থেকে রায়হান রাফীর ‘পরাণ’- সবখানেই দারুণ অভিনয় দিয়ে দর্শকের মন জয় করেছেন ইয়াশ রোহান। সিনেমাতে কম দেখা গেলেও টিভি নাটকে তিনি নিয়মিত।








