তাঁকে প্রথম দেখি কলকাতার বাবুরাম ঘোষ স্ট্রিটের “টেকনিশিয়ান স্টুডিও”তে, চলছিলো “বিমূর্ত এই রাত্রি আমার মৌনতার সূতোয় বোনা একটি রঙ্গিন চাদর” গানটির রেকর্ডিং। আমি স্বভাবতই বেশ নার্ভাস ছিলাম, দেশের বাইরে অমন প্রথিতযশা সুরকার এবং গীতিকারের সঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠদান চাট্টিখানি কথা নয়! তাছাড়া আমি তখন সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের প্রথম বর্ষে পা রেখেছি। রেকর্ডিং স্টুডিওর ছোট্ট সিঙ্গারবুথের গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে তাঁকে ঢুকতে দেখলাম- অনিন্দ্য সুন্দরি এক অপ্সরা, পরনে সাদা রঙের একটা টপ আর লংস্কার্ট, তখনো তাঁর পরিচয় জানা হয়নি।
সালটা ছিলো ১৯৭৫, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। সেসময়ে গান রেকর্ড করা হতো লাইভ অর্কেস্ট্রার সঙ্গে, অর্থাৎ সকল মিউজিসিয়ানের উপস্থিতিতে লাইভ বাদন এবং যারা ক্যয়ার সিঙ্গার তাদেরও ওই একই সময়ে ভয়েস দিতে হতো! স্টুডিও ভর্তি বাদ্যযন্ত্রী আর কলাকুশলী, আমার সৌভাগ্য কালজয়ী এই গানের সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেছিলেন প্রখ্যাত তবলা বাদক রাধাকান্ত নন্দী। আমি গাইছি আর গ্লাসের বাইরে বসে থাকা গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ভূপেন হাজারিকা আর ছবির পরিচালক আলমগীর কবিরের অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করছি, -একসময় গানের মধ্যে ডুবে গেলাম, চোখ বন্ধ করে পুরো গানটা একবারে গেয়ে ফেললাম -নির্ভুল! রেকর্ডিং শেষে সিংগার বুথ থেকে বেরিয়ে এলাম, সকলের হাস্যজ্জল চেহারা বুঝিয়ে দিলো গানটা ভালো গেয়েছি! কাছে এসে সস্নেহে মাথায় হাত রাখলেন ড. ভুপেন হাজারিকা, হাতে থাকা গাঁদাফুলের মালা পরিয়ে দিলেন আমার গলায়। আলমগীর কবির সেই অনিন্দ্য সুন্দরির হাত ধরে এগিয়ে এসে বললেন – ইনি জয়শ্রী রায়, আমার ছবি “সীমানা পেরিয়ে”র নায়িকা, হেসে হাত বাড়ালেন জয়শ্রী, আমিও হাত বাড়ালাম – “অনেক ভালো গেয়েছো”
আর ঠিক তখনি খেয়াল করলাম হাসলে তাঁর গালে টোল পরে!
গান রেকর্ডিং উপলক্ষে আমরা ছিলাম কলকাতার সদর স্ট্রিটের লিটন হোটেলে, সঙ্গে অভিভাবক ছিলেন বড়বোন রেবেকা সুলতানা এবং ভগ্নীপতি মো. সফিউল্লাহ। পরদিনই ঢাকা ফেরার কথা থাকলেও ফেরা হলোনা, ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫-এ বাংলাদেশে ঘটে যায় সিপাহি জনতার বিপ্লব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা-কলকাতার সব ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যায়, ফলে কলকাতায় দিন কয়েক বেশি থাকতে হয়। এ সময়ে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় একটা ক্যাফেতে আমরা চায়ের আড্ডা দিয়েছি। আলমগীর কবিরের সঙ্গে সেই আড্ডায় জয়শ্রী আসতেন প্রতিদিন, দারুণ গল্প আর আড্ডায় কেটে যেতো সন্ধ্যা আর এখান থেকেই আমার সঙ্গে বেশ সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তৎকালীন ‘মিস ক্যালকাটা’ জয়শ্রী রায়ের, -সেই থেকেই তিনি আমার কাছে জয়শ্রী দিদি। এ সময়ে একদিন বিকেলের আড্ডায় ভূপেন’দাও এলেন, আমি আগেই কিছুটা অনুমান করতে পারলেও সেদিন ভূপেন’দার কাছেই জানতে পারলাম পরিচালক আলমগীর কবির ও জয়শ্রী রায় একে অপরকে ভালোবাসেন এবং খুব শিগগির তারা পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হবেন। এখনকার সময়ের মতো স্মার্টফোনের যুগ হলে কতো সেল্ফিই না স্মৃতি হিসেবে তুলে রাখা যেতো!
আমরা ঢাকা ফিরে আসার সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা, একদিন সকালে হঠাৎ করেই নয়াপল্টনের আমার বাবার বাড়িতে জয়শ্রীকে সঙ্গে নিয়ে আলমগীর কবির এলেন, আমি তাঁকে জয়শ্রী’দি বলে সম্বোধন করায় আলমগীর কবির হালকা হেসে বলেন “দিদি নয়, ও এখন তোমাদের ভাবী।’’ আমার মা নতুন বৌয়ের জন্য দ্রুত আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেলেন, পরিবারের সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গল্প গুজব শেষে দুজনে বিদায় নেন। এর পরপরই জয়শ্রী রায় নামের শেষ অংশ পরিবর্তিত হয়ে স্বামী আলমগীর কবিরের টাইটেল যুক্ত হলে তিনি পরিচিত ওঠেন “জয়শ্রী কবির” হিসেবে। তারও মাসখানেক পর ওদের সঙ্গে দেখা ঢাকা ক্লাবে, “সীমানা পেরিয়ে” ছায়াছবির প্রিমিয়ার শো উপলক্ষে, সেদিন বেশ প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিলো ওদের, সাংবাদিক পরিবেষ্টিত হয়ে ছিলেন দু’জনেই।
‘’সীমানা পেরিয়ে’’ মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে।’’বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’’ -গানটিতে নবাগত গায়িকা হিসেবে আমার গায়কী, নবাগত নায়িকা জয়শ্রীর নিখুঁত লিপসিংকও আবেদনময়ি অভিব্যক্তি, গানের কথার নতুনত্ব এবং হৃদয়স্পর্শি শব্দ, ব্যতিক্রমধর্মী সুর, সেই সঙ্গে সিনেমার দৃশ্যের চমৎকার আবহ ও ক্যামেরার কাজ – সবকিছু মিলেমিশে স্রোতা দর্শকের হৃদয় তোলপাড় করে একটা চিরস্থায়ী জায়গা তৈরি করে নেয়। এটি আমার সিগনেচার সং, জীবনের শ্রেষ্ঠ গান! বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বঙ্গের লক্ষ কোটি মানুষের মনে এগান স্থান করে নিলেও শুধু প্রাপ্য সম্মানটুকু পায়নি বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র বোর্ডের কাছে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় ১৯৭৭ সালে “সীমানা পেরিয়ে” চলচ্চিত্র মোট ৪টি শাখায় পুরস্কার অর্জন করলেও ড. ভূপেন হাজারিকা সুরারোপিত এই গান জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি!
সে যাইহোক, ১৯৭৯ সালে আলমগীর কবির পরিচালনা করেন ‘’রূপালী সৈকতে” নামে আরেকটি ছবি। এই ছবিতে আমাকে দিয়ে তিনি একটা রবীন্দ্র সংগীত গাইয়েছিলেন। একদিন তিনি ফোন করে আমাকে তার বাড়িতে ডাকেন। আলমগীর ভাই এবং জয়শ্রী দম্পতি তখন ঢাকার শ্যামলীতে একটি বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। ততদিনে সংগীত শিল্পী রফিকুল আলম আর আমার বাগদান হয়ে গেছে , তাই রফিকুল আলমও ছিলেন আমার সঙ্গে। শ্যামলী পৌঁছুতে আমাদের কিছুটা দেরি হয়ে যায়, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়, অপেক্ষায় থেকে আলমগীর কবির বেরিয়ে গেছেন, বাড়িতে ছিলেন শুধু জয়শ্রী। অল্প কিছু আলাপ চারিতার পর তিনি আমার হাতে একটা খাম তুলে দিলেন, -“রূপালী সৈকতে” ছায়াছবিতে গান গাইবার সম্মানী। সেদিন তাঁকে বেশ অন্যরকম দেখেছিলাম, আগের সেই উচ্ছ্বাস ছিলোনা কণ্ঠে, কিছুটা ক্লান্ত আর বিমর্ষ দেখাচ্ছিলো! জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।
১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের মৃত্যু ঘটে। এর প্রায় কাছাকাছি সময়ে রফিকুল আলম এবং আমি অনুষ্ঠান করার জন্য ইংল্যান্ডে যাই। লন্ডনে প্রথন অনুষ্ঠান শেষ করে পরদিন আমরা পরবর্তি শো’র জন্য অন্য আরেক শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে হোটেলের লবিতে বসে আছি, সে সময়ে আয়োজকদের একজন এসে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললেন- ‘’গতরাতে অনুষ্ঠান শেষে একজন ভদ্রমহিলা এই চিরকুট আমার হাতে দিয়ে বলেছেন আপনাকে পৌঁছে দিতে।’’
হোটেলের সামনে তখন আমাদের পিকআপ করার জন্য মাইক্রোবাস চলে এসেছে, লবিতে অপেক্ষমাণ আমাদের মিউজিসিয়ান দল তখন গিটার, কিবোর্ড, তবলাসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হৈ হৈ করে গাড়ীতে উঠে যার যার সিটে বসে পরেছে। আমি গাড়ীতে বসে হাতে মুঠো করে ধরে থাকা চিরকুট খুলতে যেয়ে ভাবছিলাম হয়তো দর্শকের মধ্যে থেকে কোন ভক্ত তার ভালোবাসা জানিয়ে কিছু লিখেছে, -যা আমাদের সঙ্গে প্রায়ই ঘটে থাকে, কিন্তু চিরকুট খুলে বিস্মিত হই! চমৎকার হাতে বাংলায় লেখা “বিমুর্ত কন্যা, আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে যাবে কি করে? – জয়শ্রী দিদি’’!
আমাদের গাড়ী তখন রওনা দিয়েছে অন্য শহরে দিকে, চিরকুটে নেই কোন ফোন নাম্বার, না কোন ঠিকানা! মনটা দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। মনে মনে বললাম -এতো কাছে থেকেও দেখা হলোনা দিদি!
১২ জানুয়ারি ২০২৫, স্যোশাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে গেলো তাঁর মৃত্যু সংবাদে। জয়শ্রী কবির মানেই বাংলার মানুষের মনে স্থান করে নেয়া “সীমানা পেরিয়ে” চলচ্চিত্রের সেই অপুর্ব সুন্দরী মানবী, যিনি আজ সকল দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে চলে গেলেন! আকাশের ঠিকানায় ভালো থেকো প্রিয় জয়শ্রী দিদি ।
লেখক: আবিদা সুলতানা, প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী








