যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক সংঘাত ঘিরে যখন বিশ্ব রাজনীতি উত্তাল, তখন দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির দিকে নিবিড় নজর সবার। মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা।
ঠিক এমন অস্থির সময়ের কিছুদিন আগেই ভেনেজুয়েলায় ঘুরে এসেছেন বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার।

নাজমুন নাহারের চোখে ভেনেজুয়েলা
শুরুতেই নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নাজমুন জানান, ভেনেজুয়েলা সফর ছিল তার জীবনের অন্যতম কষ্টকর ও অ্যাডভেঞ্চারাস যাত্রা। সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক সীমান্তে চার ঘণ্টার ইমিগ্রেশন ইন্টারভিউ, শহর থেকে শহরে যাত্রাপথে বারবার পুলিশি জেরা—সব মিলিয়ে প্রতিটি ধাপ ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা।
তবুও ১৭টি শহর ঘুরে তিনি দেখেছেন তিনি। আন্দিস পর্বতমালার গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ, সবুজ উপত্যকা, নীল সমুদ্র, মরুভূমির ভ্যালি আর সাধারণ মানুষের অসাধারণ আন্তরিকতা। নাজমুনের ভাষায়, “সব কষ্ট পেরিয়ে বুঝেছি- ভেনেজুয়েলা পৃথিবীর সেরা সৌন্দর্যের এক অনন্য কোলাজ।”

চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে নাজমুন নিজের অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে। তার ভাষায়, “মাদুরোর শাসনে মানুষ বিরক্ত ছিলো- এটা সত্য। কিন্তু অন্য দেশের কেউ এসে তাদের দেশে সামরিক আগ্রাসন চালাবে- এগুলো তাদের অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।”
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ঘটনার পর নাজমুন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন সেখানকার অনেক স্থানীয় মানুষের সঙ্গে, যাদের সাথে ভেনেজুয়েলায় এক মাসের সফরে তৈরী হয়েছিলো আন্তরিকতার সম্পর্ক! তাদের বক্তব্য থেকে তিনি যে চিত্রটি বুঝেছেন, তা হলো- মাদুরোর শাসনের অবসান ভেনেজুয়েলার বহু নাগরিকই চেয়েছিলেন। তবে সেই পরিবর্তন তারা চেয়েছেন নিজেদের মধ্য থেকেই, কোনো বিদেশি শক্তির অবৈধ হস্তক্ষেপে নয়।

নাজমুন বলেন, “মানুষ বলেছে- ‘আমাদের সরকার আমাদের পছন্দ না হলেও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের।’ আমি যখন দেশটিতে একমাস ছিলাম, ১৭টি শহরে ভ্রমণ করেছি। সেখানকার মানুষদের সাথে কথা বলে বুঝেছি- আসলে ভেনেজুয়েলার মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু যুদ্ধ নয়। তারা চায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত, আগ্রাসন নয়।”
ইতিহাস গড়া এক বাংলাদেশি অভিযাত্রী
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১৮৪টি দেশ ভ্রমণের ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছেন নাজমুন নাহার। লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে প্রতিটি দেশ ভ্রমণের দ্বারপ্রান্তে তিনি এখন দাঁড়িয়ে। ১৮৪তম দেশ হিসেবে বাহামা সফরের মধ্য দিয়ে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এ অর্জনের জন্য বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস তাকে অভিনন্দন জানান।
২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ভ্রমণ করেন সামোয়া, তিমুর লেস্তে, এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, ভেনেজুয়েলা ও বাহামা।

বিশ্বমাধ্যমে বাংলাদেশের মুখ
নাজমুন নাহারের এই গৌরবময় বিশ্বভ্রমণ উঠে এসেছে ভেনেজুয়েলার ‘লা নাসিওন’, ক্যারিবীয় ‘ডব্লিউ আইসি নিউজ’, তিমুর লেস্তের ‘সুয়ারা তিমোর লোরোসায়’, পর্তুগিজ সংবাদ সংস্থা লুসাসহ বিশ্বের বহু গণমাধ্যমে।
বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি তিনি তুলে ধরছেন মানবতার বার্তা ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেইভ দ্য প্ল্যানেট’, ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’।
সংগ্রাম পেরিয়ে…
২০০০ সালে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা নাজমুন একজন সলো ট্রাভেলার। সড়কপথে পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন অসংখ্যবার, তবু থামেননি।

লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া এই নারী সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ডসহ ৫৬টির বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা।
লাল-সবুজের পতাকা বহন করে বিশ্বের পথে পথে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে করতে নাজমুন নাহার আজ শুধু একজন পরিব্রাজক নন- তিনি হয়ে উঠেছেন শান্তি, সাহস ও স্বপ্নের এক জীবন্ত প্রতীক।








