বিচিত্রমুখী প্রবণতায় পরিপূর্ণ এক অনন্য প্রতিভার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬ তম জন্ম বার্ষিকীতে নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন, “যৌবনের বিশিষ্ট দুটি গুণ যদি হয়—বিদ্রোহ আর প্রেম, তবে নজরুল ইসলাম তার অনাবিল প্রাচুর্য।” তাই তো বলা হয়, কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়।
তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের নিকটবর্তী চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ এবং মা জাহেদা খাতুন। এই দম্পতির আগের চার সন্তান অকালমৃত্যুর শিকার হওয়ায় তাঁদের পরবর্তী পুত্র নজরুলকে তাঁরা “দুঃখের পথের পথিক” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তাঁর নাম রাখেন “দুখু মিয়া”। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবন শুরু করেছিলেন নজরুল। সেই দারিদ্র্য তাঁকে যেমন লড়াই করতে শিখিয়েছে, তেমনি তাঁর সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্মে বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব সম্পর্কে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল—“কাজী বাড়ীর বিড়ালও কমপক্ষে তিনটি পাঠ পড়ে নেয়।” তবে সেই কাজী পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলামকে শৈশবে যখন মনোযোগ সহকারে স্কুলে পড়াশোনা করার কথা ছিল, তখন দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে জীবনের এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে ছুটতে হয়েছে। তাই তাঁর শৈশবজীবনে দেখা যায় কবর, মসজিদ, মক্তব এবং পরে মাত্র দশ বছর বয়সে লেটো দলে যোগদান।
তখনকার দিনে লেটো দল ছিল পল্লী সংস্কৃতির একটি অনন্য মাধ্যম। এই দলের পল্লী কবিদের ছন্দ-গাথায় রচিত নাটক, গ্রামীণ অভিনেতাদের নৃত্য-গীতাভিনয়, কবিদের লড়াই, বিচার ও বিতর্ক শুধু শ্রোতা-দর্শকদের মনোরঞ্জন করত না, বরং ভালো-মন্দের বিচার করার দিকও নির্দেশ করত। লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নজরুল ওই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
যদিও লেটো দলে যোগদানের পেছনে তাঁর মূল কারণ ছিল অর্থোপার্জনের প্রয়াস, তবুও গান ও অভিনয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ নজরুলকে এই দলে টেনে নেয়।
তাই কিশোর নজরুলের রচনায় লোকজ ধারার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তাঁর লেখায় দেখা যায় রামপ্রসাদী, বাউল এবং মারফতি গানের উপাদান। উদাহরণস্বরূপ, তিনি লিখেছেন, “চাষ কর দেহ জমিতে/ হবে নানা ফসল এতে/ নামাজে জমি ‘উগালে’/ রোজাতে জমি ‘সামালে’/ কলেমায় জমিতে মই দিলে/ চিন্তা কি হে এই ভবেতে।
কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল জীবনের শুরু তাঁর শৈশবে। তাঁর লেখালেখিতে মক্তব, মসজিদ এবং লেটো দলের অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট।
তিনি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেছেন এমন পঙক্তি: “জীবন যাপন করিতে/ চাষ কর বিধি-মতে/ রবে যদি সুখেতে/ এ পৃথিবী মাঝার।”
মক্তবে ও মসজিদে তাঁর অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলেছিল পরিণত বয়সে ইসলামের মূল ভাবধারার প্রতি। নজরুল তাঁর ‘চাষার সং’-এ লিখেছেন, “আমি আল্লা নামের জীব বুনেছি এবার মনের মাঠে ফলবে ফসল বেচবো তারে কিয়ামতের হাটে।”
গানের আসর শুরু করার ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য রচনা, “সর্বপ্রথমে বন্দনা গাই/তোমারই ওগো বারীতালা তারপরে দরদে পড়ি/মোহাম্মদ সাল্লে আল্লা।”
লেটো দলের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল গভীর এবং নিবিড়। নিমসা লেটো দলে তিনি এতটাই আপন হয়ে গিয়েছিলেন যে, যখন খুদে ওস্তাদ দল ছেড়ে যান, তখন তাঁকে নিয়ে গান বাঁধা হয়, “আমরা এই অধীন হয়েছি ওস্তাদহীন ভাবি তাই নিশিদিন, বিষাদ মনে নামেতে নজরুল ইসলাম, কি দিব গুণের প্রমাণ।”
কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম যেমন প্রেম ও বিদ্রোহের মিশেল, তেমনি তাঁর ব্যক্তিত্বেও ফুটে ওঠে এক অনন্য মানবিকতা ও উদারতা। নজরুলের জীবন ও সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা পাই একটি মহৎ ও উদার হৃদয়ের মানুষকে। তাঁর সাহিত্যিক মহত্ত্ব আজও তাঁকে অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য করে রেখেছে। দেশভাগের আগে ব্রিটিশ ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ মোদাব্বের। তিনি তাঁর লেখায় নজরুলের জীবন থেকে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা নজরুলের উদারতা ও মানবিকতার পরিচয় দেয়।
মোদাব্বের লিখেছেন, “কাজী নজরুল ইসলাম তখন লিখে চলেছেন সব ধরনের গান কাব্য, গীতি, গজল, হামদ, নাত এবং শ্যামাসঙ্গীত। খাতার পর খাতা পূর্ণ হচ্ছে গানে। একদিন এরকম দুটি গানের খাতা চুরি হয়ে যায়। প্রথমে কবি বেশ অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, পরে একেবারে শান্ত হয়ে যান। কিছুদিন পর সেই খাতাগুলি এক বিখ্যাত কবি ও গীতিকারের বাড়িতে দেখতে পাই। আমি খবরটি কবিকে জানাতেই তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘চেপে যা, যেন আর কাউকে বলিসনে।’
এই ঘটনায় মোদাব্বের বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কিছু বলবেন না? এতগুলো গান চুরি হলো!” কবি হেসে উত্তর দেন, “সাগর থেকে কেউ দু’কলস জল নিলে সাগরের জল কি কমে যায় রে পাগল!” এই বক্তব্যে কাজী নজরুল ইসলামের আকাশসম উদারতার পরিচয় মেলে।
একটি ঘটনায় তিনি উল্লেখ করেছেন, কলকাতার তালতলা অঞ্চলে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য একটি ছাত্রাবাস গঠন করেছিলেন নজরুল ও তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। সেখানে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন গরিব ছাত্রের বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। একদিন ছাত্ররা আবদার করলেন যে, তাঁদের ছাত্রাবাসে কবি নজরুলকে একবার নিয়ে আসতে হবে। কবিকে আনার দায়িত্ব পড়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরের উপর। মোদাব্বের কবিকে বিষয়টি জানিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের পক্ষ থেকে করুণ আকুতি প্রকাশ করেন। কবি বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে যান।
এক রবিবার দুপুরে মোদাব্বের কবি নজরুলকে নিয়ে যান সেই ছাত্রাবাসে। কবি সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। তাঁরা নজরুলের কাছ থেকে পল্টন জীবনের গল্প এবং জেলজীবনের অভিজ্ঞতার কথা শুনলেন। এরপর কবি আবৃত্তি এবং গান পরিবেশন শুরু করলেন। মজলিস জমে ওঠে, সময় যেন থেমে যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, এবং সন্ধ্যা থেকে রাত তবু সেই আসরের মগ্নতায় কোনো বিরতি নেই। তখনই ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। হঠাৎ হৈচৈ করতে করতে পাঁচ-ছয়জন যুবক সেই মজলিসে প্রবেশ করেন। তাঁরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কবির উপস্থিতিতে বাধা দেন। কারণ, রামমোহন লাইব্রেরিতে কবি নজরুলের জন্য একটি সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল, যার নির্ধারিত সময় ছিল সন্ধ্যা সাতটা। অথচ কবি তখনো ছাত্রাবাসে আটকে আছেন। যুবকেরা আয়োজকদের প্রতি তীব্র তর্জন-গর্জন শুরু করেন এবং তাঁদের ‘অভব্যতা’ নিয়ে অভিযোগ তোলেন। পরিস্থিতি সামলাতে আয়োজক এবং সাংবাদিক মোদাব্বের অনেক কষ্টে তাঁদের বোঝান যে ছাত্ররা সম্বর্ধনার বিষয়ে জানতেন না। যদি তাঁরা জানতেন, তবে অবশ্যই তাঁরা নজরুলকে যথাসময়ে রামমোহন লাইব্রেরির সভায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ মোদাব্বের, যিনি ব্রিটিশ শাসন, ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের অভ্যুদয়, এবং স্বাধীন বাংলাদেশের তিনটি যুগান্তকারী সময়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, নজরুলকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিগুলো বিশদভাবে লিখে গেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদকে ভূষিত হন।
সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বের তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ ‘সাংবাদিকের রোজনামচা’-তে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একাধিক স্মৃতিচারণ করেছেন। এমনই একটি স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লেখেন, “আমি আসল নজরুল ইসলামকে দেখি ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের এক গভীর রাতে। তখন কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে নিখিল ভারত কংগ্রেসের অধিবেশন হচ্ছিল।
ভারত ছাড় আন্দোলনের ঐতিহাসিক এক নায়ক সুভাষ চন্দ্র বোস তখন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অধিনায়ক। প্রদেশের সকল জেলা থেকে ছাত্র যুবকরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রামের দলটায় ছিল বেশ বড় এবং বেপরোয়া। এই সময়ে আমি একটি রাজনৈতিক দলে যোগদান করি। সেই হিসেবে এক পরামর্শক সভায় আমিও যোগদানের নির্দেশ পাই। মিস্টার জে. সি.গুপ্তের কনিষ্ঠ পুত্র কল্যাণ গুপ্ত এই সভায় আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
পার্ক সার্কাসে মি.জে.সি.গুপ্তের বাড়ির পেছনের দিকের একটি হলে রাত ১০টায় সভা বসলো। সবাই যেন তার আগমন প্রতীক্ষা করছে। অল্পক্ষণের মধ্যে সে প্রতীক্ষার অবসান হল। দেখলাম, সামরিক বাহিনীর জেনারেলের পোষাকে সুভাষচন্দ্র এবং তাঁর পেছনে এক মাথা ঝাঁকড়া বাবরি চুল দোলাতে দোলাতে ঘরে ঢুকলেন বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। পরনে খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবী, তার উপর একটি কাশ্মীরী শাল। কবিকে সেই প্রথম দেখার মতো দেখলাম, মুগ্ধ হলাম, শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল। আগে কাগজে কাগজে তাঁর লেখা পড়েছি, বই পড়েছি, তাঁর রচিত গান শুনেছি কিন্তু তাঁকে প্রত্যক্ষ করলাম এই প্রথম, এটাই আমার জীবনের স্মরণীয় দিন।
ওই সভায় সেদিন দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়, স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ব্রিটিশ শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সভার মূল আকর্ষণ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবি সেদিন উপস্থিত সবাইকে শপথ পাঠ করান। তাঁর কণ্ঠে সেদিন যেন গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞা এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসান চাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
মোহাম্মদ মোদাব্বের তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, সভা শেষে সুভাষচন্দ্র বসু ঘোষণা করেন: “আগামীকাল কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু করতে হবে নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ সংগীত দিয়ে। অবাঙালি নেতারা যদি রাজি না হয়, তাহলে দক্ষযজ্ঞ শুরু করে দেব।” এই ঘোষণা শুনে উপস্থিত সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।
বিদায়ের আগে সুভাষচন্দ্র বসু সবাইকে কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। মোহাম্মদ মোদাব্বেরের সঙ্গে করমর্দন করতে করতে তিনি বলেন: “এ যে দেখছি লিগ-বিগ সিং। পুলিশের ঠ্যাঙ্গা সইতে পারবি তো?”পাশে দাঁড়িয়ে সুভাষচন্দ্র বসু হাসতে হাসতে যোগ করেন: “গায়ে জোর না থাক, মাথায় জোর আছে।”
এ সময় কবি নজরুল মোদাব্বেরকে জিজ্ঞেস করেন, “বাহারকে চিনিস? চাটগাঁর বাহার!” মোদাব্বের উত্তরে জানান, তখনো তিনি বাহার সাহেবের নাম শোনেননি। তিনি শুধু কলকাতার এক খেলোয়াড় বাহারকে চিনতেন। কবি হেসে বলেন যে, তিনি যে চাটগাঁর বাহারের কথা বলছেন, তিনি আসলে তাদের দলের হাবিবুল্লাহ চৌধুরী।
মূলত কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঢেউ উঠছিল। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঘিরে শুরু হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আন্দোলন, যা স্বদেশী আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। এই স্বদেশী আন্দোলন ক্রমান্বয়ে উপনিবেশিক ভারতের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ শাসনের শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতজুড়ে শুরু হয় ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। এই সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দমন-পীড়ন এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিপরীতে মহাত্মা গান্ধী অহিংসার রাজনীতি ও শান্তির বাণী নিয়ে আবির্ভূত হন।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শুরু হয় প্রথম মহাযুদ্ধ। এসব বৈশ্বিক ঘটনার ঢেউ ব্রিটিশ শাসিত ভারতে এসে আছড়ে পড়ে। এইসব ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের বিরূপ প্রভাব নজরুলের কিশোর বয়সকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
কিশোর নজরুলকে দেখা যায়, তাঁর সমবয়সী আরেক কিশোর অবস্থাপন্ন জেঠামশায়ের পোষ্যপুত্র পঞ্চননের পাখি মারা এয়ারগান হাতে নিয়ে নির্জন কবরখানায় ইট বাঁধানো বেদিগুলোতে লক্ষ্যভেদ করার খেলা খেলতে। ওই বেদিগুলো তাঁর কল্পনায় পরিণত হয়েছিল বড় লাট, ছোট লাট, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং এসডিওদের প্রতীকে। এয়ারগানের সিসের গুলিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করলে কিশোর নজরুল কল্পনায় দেখতেন, সেগুলো যেন দেশের শত্রু ইংরেজদের শরীরে গিয়ে আঘাত করছে। তাঁর ওই সময়কার বন্ধু শৈলজানন্দ একদিন কিশোর নজরুলকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘বড় লাট, ছোট লাট-ওরা তো চাকরি করে, ওরা কি দোষ করল?’ নজরুলের জবাব ছিল, ‘না, ওরা ইংরেজের প্রতিনিধি। আর ইংরেজ মানে আমাদের ও দেশের শত্রু। আমাদের দেশ ছেড়ে ইংরেজদের চলে যেতে হবে, নইলে আমরাই ওদের মেরে তাড়াব।’
বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এমন রাজনীতি সচেতনতার বীজ ক্রমেই বিকশিত হয়ে ডালপালা মেলেছে। সত্যিই একদিন তিনি যুদ্ধের তাড়নায় নাম লেখালেন সৈন্যদলে। তখন ১৯১৭ সাল। রাণীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম। সামনেই মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে, হঠাৎই তিনি সৈন্যদলে যোগ দিলেন।
উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের সূচনায় ইউরোপের দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটেই নজরুল ইসলাম সৈনিক হিসেবে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুেদ্ধ অংশগ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক মনোভাবের এক বিস্ময়করভাবেই প্রভাবিত করে।
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী সত্তা, কবি ও সাহিত্যিক ভাবাদর্শ, এবং সৃজনশীল সৃষ্টিকমে ছাপ রেখেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। বিশেষত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারার এমন লজ্জাজনক উন্মুক্ততা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদী চিন্তার উদ্ভব, এবং সামরিক জোটের টানাপোড়েন নজরুলের চিন্তা ও আবেগকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
যদিও ব্রিটিশ শাসিত ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ লাল ফৌজে বাঙালিদের নিয়োগ করা হত না।এর কারণ বাঙালিরা যুদ্ধে অপারগ ছিলেন এই ধারণা নয়; বরং ব্রিটিশ সরকার বাঙালিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের বিশ্বাস করতে ভয় পেত। এর চেয়ে বাঙালিদের কেরানিরূপে কাগুজে কাজে লাগিয়ে বশ্যতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখাই ছিল ব্রিটিশদের জন্য নিরাপদ। তবে এক পর্যায়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাঙালিদের সৈন্যদলে ভর্তির দাবিতে জোর লেখালেখি শুরু হয়। দীর্ঘযুদ্ধে জর্জরিত মিত্রশক্তি ও কেন্দ্রীয় শক্তির চাপ বিবেচনা করে ১৯১৭ সালে ভারতের ব্রিটিশ সরকার একটি বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি গঠনের অনুমোদন দেয়। দেশের নেতারাও তখন বাঙালিদের সৈন্যদলে যোগ দিতে আহ্বান জানান।
শহরের অলিতে-গলিতে “বাঙালি পল্টনে যোগ দাও” শ্লোগান লেখা পোস্টার টাঙানো হয়। রঙিন, বড় বড় পোস্টারগুলো বিচিত্র ছবি ও ভাষায় বাঙালি যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালায়। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিচারণমূলক বই কেউ ভোলে না কেউ ভোলে-তে সে সময়ের শ্লোগান ও পোস্টারগুলোর মাধুর্যপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। পোস্টারের ভাষা ছিল, ‘কে বলে বাঙালি যোদ্ধা নয়, কে বলে বাঙালি ভীতু? বাঙালি জাতির এই কলঙ্ক মোচন করা একান্ত কর্তব্য। আর তা করতে পারবে বাংলার যুবশক্তি। ঝাঁপিয়ে পড়ো সিংহবিক্রমে। বাঙালি পল্টনে যোগ দাও।’
নজরুল ইসলামের শৈশবের বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, কাজী নজরুল ইসলাম যুদ্ধবিদ্যা শিখে ভারতবর্ষে একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল সেই বাহিনী দিয়ে ইংরেজদের দেশ থেকে তাড়ানো। ইংরেজ তখন জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। উপনিবেশিক ভারতবর্ষে কেউই ইংরেজ শাসনে সন্তুষ্ট ছিল না। ইংরেজদের শোষণ, নিপীড়ন ও শাসনে জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিল। তাই নজরুল ইংরেজদের হয়ে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে যুদ্ধ ছিল একটি বিদ্যা, এবং তিনি সেই বিদ্যা ইংরেজদের কাছ থেকেই শিখতে চেয়েছিলেন।’
করাচিতে সৈনিক জীবনের মধ্যেও নজরুল সাহিত্যসৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর এই সময়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলো কলকাতার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেসব লেখার তালিকায় অন্যতম গল্প বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ গল্প, ‘স্বামীহারা’ ‘ব্যথার দান’ বঙ্গীয় ‘মুক্তি’ নামে বহুল আলোচিত কবিতা, হাসির কবিতা ‘কবিতা সমাধি’, প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ ইত্যাদি। এছাড়াও নওশেরা, কাবুল, মেসোপটেমিয়া এবং ভার্দ্যূন ট্রেঞ্চ সম্পর্কিত লেখাগুলো সবই তাঁর সৈনিক জীবনে করাচি ক্যান্টনমেন্টে বসে রচিত। এই লেখাগুলোর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবহ কবিতা ‘শাতিল আরব’ উল্লেখযোগ্য।
নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলামের মতে: “কল্পনাপ্রসূত হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর লেখাগুলো বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখার একটি নতুন পথ দেখিয়েছে। নজরুলের আগে কেউ আধুনিক যুদ্ধ নিয়ে এমন লেখা রচনা করেননি।”
এই রচনাগুলোতে নজরুলের শক্তিশালী কল্পনা ও সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে, যা বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধের নান্দনিক বিবরণের এক অনন্য সংযোজন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








