আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সারাদেশের ৮ হাজার ৭৭০টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রকে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রেখে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে এবার প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর ভেতর ও আশপাশে স্থাপিত ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সহিংসতা দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নির্বাচন কমিশন বলছে এই নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফলে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন এবং নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন নারী ভোটার রয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
ইসি জানায়, নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। সবচেয়ে বেশি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া, ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন এবং পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন পরিচালনায় প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রায় ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকবেন বলে জানায় নির্বাচন কমিশন।
ভোট নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই: ইসি সচিব
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ভোট নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই এবং নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ২৯৯ আসনের ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি উপকরণ ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টার ভোটের মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করাই কমিশনের লক্ষ্য।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, ভ্রাম্যমাণ টহল এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রের পরিস্থিতি রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের কন্ট্রোল রুম থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নির্বাচনের পরিবেশ ইতিবাচক: ইইউ’র প্রধান পর্যবেক্ষক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মাঠের পরিবেশ ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ইভারস আইজাবস। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, জানুয়ারি থেকে প্রায় ৬০ জন দীর্ঘমেয়াদি ইইউ পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে রয়েছেন এবং আজ থেকে স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকরাও মাঠে কাজ শুরু করেছেন। ইইউ’র ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও কানাডার পর্যবেক্ষকরাও এই মিশনে যুক্ত রয়েছেন।
ইভারস আইজাবস বলেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী পরিবেশ আশাব্যঞ্জক এবং অনেকের মতে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
নির্বাচনে জঙ্গি হামলার শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আইজিপি
মঙ্গলবার নির্বাচনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা না ঘটলে জঙ্গি হামলার তীব্র আশঙ্কা থাকত না। বর্তমানে বড় শঙ্কা না থাকলেও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনে জঙ্গি হামলার কোনো শঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণাকালেই মূল আশঙ্কা ছিল। তবে প্রচার শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনো ঘটনা না ঘটায় এখন জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নেই।
নির্বাচনে তিন স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা
আইজিপি বলেন, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা তিন স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে থাকবে স্ট্যাটিক ফোর্স, এর বাইরে থাকবে মোবাইল টিম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্ট্রাইকিং ফোর্স।
তিনি জানান, প্রথম স্তরে দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯ ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। দ্বিতীয় স্তরে কেন্দ্রের বাইরে ভ্রাম্যমাণ ভিত্তিতে টহল ও তদারকির জন্য পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে। তৃতীয় স্তরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন স্থানে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
এবার নির্বাচনে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া প্রায় ছয় লাখ আনসার সদস্য, এক লাখ সেনা সদস্যা, বিজিবি ও র্যাব মোতায়েন থাকবে বলে জানান বাহারুল আলম।
আইজিপি বলেন, নির্বাচনী নিরাপত্তায় এক লাখ ৫৭ হাজার ৮০৫ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এর মধ্যে নয় হাজার ৩৯১ জন ভোটকেন্দ্রে স্ট্যাটিক ফোর্সের দায়িত্ব পালন করবেন। বাকিরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ইউনিটে কাজ করবেন। এ ছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত সহায়তার জন্য আরও ২৯ হাজার ৭৯৮ পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন।
৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ
আইজিপি জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশ আট হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ১৬ হাজার কেন্দ্র মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ। আর প্রায় ১৬ হাজার কেন্দ্রকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ ও মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কেন্দ্র বডি-ওর্ন ক্যামেরার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা বলয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। নির্বাচন কমিশনের আওতাভুক্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে। এ ছাড়া প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী পুলিশ সুপারেরা ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণ করবেন।
এদিকে নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। এ সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কেউ সেখানে অবস্থান করতে পারবেন না।
পাশাপাশি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।







