ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে এক পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১৪।
র্যাব জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় সংঘটিত ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নিহত যুবকের নাম দিপু চন্দ্র দাস (২৭)। তিনি ভালুকা উপজেলার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে কারখানার ভেতরে এক শ্রমিক দিপুর বিরুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগ তোলেন। অভিযোগটি ছড়িয়ে পড়লে কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা কারখানার ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মীরা দিপুকে কারখানা থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেন।
এরপর কারখানার সামনে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একদল বিক্ষুব্ধ মানুষের পিটুনিতে দিপু ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে তার মরদেহ সড়কের পাশে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে আবারও মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাত পৌনে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের স্বজনরা দাবি করেছেন, দিপুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে পরিবার ও স্বজনদের মাঝে শোকের মাতম নেমে আসে। দিপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস ছেলের মরদেহ দেখে আহাজারি করে বলেন, তার ছেলে ধর্ম অবমাননার মতো কোনো কাজ করতে পারে না।
দিপু ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে তিনি ২০১৮ সালে ডিগ্রি পাস করার পর একটি কোম্পানিতে চাকরি নেন। তার মেজো ভাই একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন এবং ছোট ভাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
এ ঘটনায় নিহত দিপুর ছোট ভাই তপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ভালুকা মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফিরোজ হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।








