খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা মধ্যবয়সী নারী মুসলিমা। যিনি একজন গৃহিণী। বাড়িতে হাঁস-মুরগী পালন করেন এবং মাঝে মধ্যে কাঁথাসেলাই করেন। বেশ কয়েক বছর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাশের তালগুনিয়া গ্রাম থেকে এসে তিনি স্বপরিবারে এখানে বসবাস শুরু করেন। তবুও যেন প্রকৃতির সাথে তাদের লড়াই থামছে না।
গ্রামটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চারপাশের নদীভাঙ্গন ও জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়েছে, কমে গেছে কর্মসংস্থানের সুযোগও।
মুসলিমার মতো এই অঞ্চলের আরও অনেক নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে কাজ করছে ‘নারী-উইমেন ফর ক্লাইমেট’ শীর্ষক প্রকল্পটি।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাপড় দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করছে, যাতে তারা এসব কাপড়কে নতুনভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে পারে। এই উদ্যোগের ফলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ফ্যাশনের প্রচার ছাড়াও নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
‘নারী-উইমেন ফর ক্লাইমেট’ প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ইউনেস্কো ও উইমেনএটডিওর ‘উইমেন লিডারশিপ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি প্রোগ্রাম’ এর আওতায়। গ্লোবাল এই এক বছরের প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি পাঁচ তরুণী প্রকল্পটির প্রতিষ্ঠা করেছেন। যাদের প্রত্যেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী।
তাদের মধ্যে রয়েছেন হুমায়রা আনজীর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), আর্লিন কারিম (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), সুস্মিতা হাওলাদার (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), নওশীন ফেরদৌস (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়) এবং এলিন মোহনা বিশ্বাস (ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি)। তারা সবাই জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছেন।
প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা হুমায়রা আনজীর বলেন, ‘নারী-উইমেন ফর ক্লাইমেট’ প্রকল্পটি নারী ক্ষমতায়নের একটি দৃষ্টান্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস, যা আমরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে পরিচালনা করছি। যদিও বর্তমানে খুলনা অঞ্চলের নারীদের নিয়ে কাজ করছি। তবে পর্যাপ্ত সহযোগিতা ও অর্থ সহায়তা পেলে এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের নিয়েও কাজ শুরু করবে।
প্রকল্পটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আরলিন কারিম বলেন, আমরা ইতোমধ্যে তিনটি কর্মশালা সম্পন্ন করেছি, যেখানে মোট ২৩ জন নারী অংশগ্রহণ করেছেন এবং সরাসরি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ অঞ্চলের নারীরা হাতের কাজে বিশেষ দক্ষ এবং এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা পরিবেশবান্ধব কিছু পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদান করবো, যা তাদের সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সুগম করবে। তাদের গল্প এবং পণ্য আমাদের প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরে আমরা জনগণের মধ্যে দায়িত্বশীল ক্রেতা হওয়ার আহ্বান জানাবো।
‘নারী-উইমেন ফর ক্লাইমেট’ প্রকল্পটি ইউনেস্কো ও উইমেনএটডিওর উদ্যোগে ‘ড্রিম ফর চেঞ্জ’ প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬০টি প্রজেক্টের মধ্যে সেরা ২০টি প্রজেক্টের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এরই মধ্যে তারা দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে পার্টনারশিপও শুরু করেছে।
কয়েকটি জলবায়ু প্রতিষ্ঠান, নারী সংগঠনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ ও বাংলাদেশ গবেষণা সংসদের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং তারা গবেষণা কার্যক্রমে সহযোগিতা করার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের স্বালম্বীকরণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে আগ্রহী।








