রাজধানীর গুলশানে সুমন মিয়া হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় পাঁচজন দুর্বৃত্ত। এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর তকমায় থাকা এক ব্যক্তির ঘনিষ্টজন হওয়ার রাজনৈতিক মহলসহ অপরাধী চক্রের টার্গেটে ছিলেন সুমন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, ঘটনাস্থলের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখাতে অস্ত্র হাতে যাদের পালাতে দেখা গেছে, তাদের নাম-পরিচয় শনাক্তে মাঠে কাজ চলছে। নাম পরিচয় পাওয়া গেলে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হলেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এদিকে শুক্রবার রাতে নিহত সুমনের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার গুলশান থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা (নং-৩২) করেন।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে গুলশান-১ পুলিশ প্লাজার উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বে ডা. ফজলে রাব্বি পার্কের পূর্ব দিকের রাস্তার পাশের বেঞ্চে বসে বিশ্রাম করাকালে সুমনকে লক্ষ্য করে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। তখন জীবন রক্ষার্থে সুমন দৌড়ে গুলশান শুটিং ক্লাবের দিকে যাওয়ার সময় রোড ডিভাইডারের কাছে পড়ে যায়। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে সুমনকে উদ্ধার করে পুলিশ চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার এজাহারে যা রয়েছে
এজাহারে মৌসুমী আক্তার উল্লেখ করেন, তার স্বামী মহাখালী টিবি গেট এলাকায় প্রিয়জন নামক ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। ইন্টারনেট ব্যবসার কারণে একই এলাকায় তার কিছু প্রতিপক্ষ গ্রুপ সৃষ্টি হয়। এ প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজন বিভিন্ন সময় সুমনকে মেরে ফেলার জন্য বিভিন্ন হুমকি দিত। জীবনের ঝুঁকি আছে বলে সুমন প্রায় সময় তার স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এছাড়া সুমনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় কিছু লোকের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল।
কে এই সুমন মিয়া
সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন অপরাধ জগতে তিনি ‘শুটার’ হিসেবে পরিচিত। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিহত সুমন স্থানীয় জেল ফেরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্টজন হিসেবে কাজ করছিলেন। এ কারনে অনেকেরই চক্ষুশুল হয়ে পড়েছিলেন। মহাখালী এলাকার বিভিন্ন সরকারী অফিসে টেন্ডার, ডিশ, ইন্টারনেট ব্যবসায় শুরু হয়েছিলো অস্থিরতা।
গত ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর থেকেই চলছিলো অস্থিরতা। তবে ঠিক তিন মাস আগে স্থানীয় সেন্টু মিয়া নামের একজনকে গুলশানে মারধরের পর পিস্তল দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগে ছিলো নিহত সুমন ওরফে টেলি সুমনের বিরুদ্ধে। এবার এবার সেন্টুর বোনের স্বামী রুবেলের নিশানায় পরিণত হলেন টেলি সুমন। এমন অভিযোগ নিহতের পরিবারসহ স্থানীয়দের।
একাধিক সূত্র বলছে, এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর তকমায় থাকা এক ব্যক্তির ঘনিষ্টজন হওয়ার রাজনৈতিক মহলসহ অপরাধী চক্রের টার্গেটে ছিলেন সুমন। ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে সুমন সম্প্রতি স্থানীয় রুবেল নামের এক ব্যবসায়ীর ইন্টারনেট এবং টেন্ডার ব্যবসায় বাধা দিচ্ছিলেন। সবশেষ রুবেলের শ্যালক সেন্টু মিয়াকে গত ২১ ডিসেম্বর গুলশান-১ এর ২১ নম্বর রোডে মারধোরের পর নাইন এমএম পিস্তল দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগ আসে সুমনের বিরুদ্ধে। এর পর থেকেই সুমনকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে রুবেল। সহায়তা নেন স্থানীয় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ বিদেশে পালিয়ে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালীর।
পুলিশ বলছে মহাখালী, গুলশান, বাড্ডা, হাতিরঝিল ও রামপুরা অঞ্চলের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকারী কোনো গ্রুপের হাতে সুমন খুন হয়ে থাকতে পারেন। এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হত্যার তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন: বাড্ডা, গুলশান ও মহাখালী অঞ্চলের অপরাধজগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রণকারী রবিন-ডালিম গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন সুমন। ভাড়ায় জমি দখলসহ নানা অপরাধে তিনি জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাড্ডা এলাকায় বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিনসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাসহ অন্তত পাঁচটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রবিন-ডালিম গ্রুপের হয়ে সুমন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। চাঁদা না পেয়ে গত ১৭ জানুয়ারি বাড্ডা এলাকায় জুয়েল খন্দকার নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে জামিনে মুক্ত হন। জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি নিজেই হত্যার শিকার হলেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এন এস নজরুল ইসলাম বলেন, নিহত সুমনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা ছিল। তিনি একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য ছিলেন। আন্তঃগ্রুপ কোন্দল থেকে হত্যা হতে পারে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ চলছে।
সুমনের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন ইউনিয়নের সালাইপুরে। তার বাবার নাম মাহফুজুর রহমান। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুমন রাজধানীর ভাষানটেক এলাকায় থাকতেন।
হত্যায় অভিযুক্ত কে এই রুবেল
জানা যায়, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন রুবেল। এক সময় মুকুলের হয়ে কাজ করা তারই ঘনিষ্ট সহযোগী বাড্ডা এলাকার রবিন এবং মাহবুব। বহুল আলোচিত ২০০৮ সালে যুবলীগ নেতা লিটন পাশা হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ছিলেন রুবেল। এর আগে রাজধানীর কুড়িল এলাকায় ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ সহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। তবে জামিনে আসার পর অনেকটাই আড়ালে চলে যান। তবে মহাখালি টিবি গেট এলাকার সরকারী অফিসের টেন্ডার এবং ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। সরাসরি অপরাধ কর্মে না জড়ালেও শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের ঘনিষ্ট সহযোগী হওয়ায় রুবেলের আধিপত্য ছিল ওই এলাকায়।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল
সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সুমনকে গুলি করা দুর্বৃত্তের একজন সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত ছিল। পুলিশ প্লাজার সামনের সড়কে ওই সময় যানবাহনের কিছুটা যানজট ছিলো। ওই ভিরের মাঝে দুই ব্যক্তিকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে। তাদের দুইজনের হাতেই পিস্তল বা অস্ত্র থাকতে দেখা গেছে। তারা দ্রুতই পালিয়ে যাচ্ছিল।
যা বলছে পুলিশ
ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. তারেক মাহমুদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সুমন মিয়া হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। রুবেল গ্রুপের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবসার দ্বন্দ্ব ছাড়াও অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। থানার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও র্যাব এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে।
গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. আল আমিন হোসাইন বলেন, আমরা আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আসামিদের নাম নাম পরিচয় খুঁজে বের করা চেষ্টা চলছে। তবে যে ফুটেজ গুলো পেয়েছি সেগুল অনেকটা অস্পষ্ট। সেখানে শুধু আসামিদের দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে।
সেভেন স্টার গ্রুপ বলে কিছু নেই: পুলিশ
নিহত সুমনের স্ত্রী মৌসুমী আক্তারে দাবি মহাখালী এলাকার ‘সেভেন স্টার গ্রুপের’ সদস্যরা সুমন হত্যায় জড়িত। তবে পুলিশ বলছে সেভেন স্টার গ্রুপ বলে কিছু নেই। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বিভিন্ন অপরাধী দল ‘ফাইভ স্টার’, ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশের পর থেকে অপরাধ জগতে এসব গ্রুপের আর অস্তিত্ব নেই।








