এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সাধারণত ৩০০টি সাধারণ আসনে সরাসরি ভোটগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার কাঠামোও সেই লক্ষ্যেই সাজানো। তবে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই যে বাস্তবে ৩০০টি আসনের সবগুলোতে ভোটগ্রহণ হয়েছে তা নয়।
নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অন্তত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটগ্রহণের মাধ্যমে সব ৩০০ আসন পূরণ হয়নি।
আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বাদল (৫১) মারা যাওয়া ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচনি কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করার বিষয়ে বাংলাদেশের ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২’-এ সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
আরপিও (RPO) ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ১৭(১) এর ব্যাখ্যা
আইনের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর এবং ভোটগ্রহণের আগে কোনো ‘বৈধভাবে মনোনীত’ প্রার্থী মৃত্যুবরণ করেন, তবে সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচনি কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে।
আইনের মূল পয়েন্ট
প্রার্থীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা একটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই আসনের নির্বাচনি কার্যক্রম বাতিলের ঘোষণা দেবেন। সংশ্লিষ্ট আসনে নতুন করে নির্বাচনের জন্য পুনরায় তফসিল ঘোষণা করা হবে। যারা আগে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এবং যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ছিল, তাদের নতুন করে ফরম জমা বা জামানত দিতে হবে না। শুধুমাত্র নতুন প্রার্থীরা ওই আসনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রথম সংসদ নির্বাচনে সব আসনে ভোট হয়নি
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ মার্চ ১৯৭৩। এটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। তবে এই নির্বাচনে ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে কয়েকটি আসনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ওই সব আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অর্থে এই নির্বাচনেও ৩০০ আসনের সবগুলোতে ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হয়নি।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন বয়কটের নির্বাচন
সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর একটি হলো ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নির্বাচন বয়কট করে।
এর ফলে অধিকাংশ আসনে কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল না। বহু আসনে প্রার্থীরা ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হন। আইনগতভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বাস্তবে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।
এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংসদ ভেঙে যায় এবং নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।
১০ম সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে ভোট হয়নি
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে একটি বড় ব্যতিক্রমী ঘটনা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।
এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে মাত্র একজন করে প্রার্থী ছিলেন। এসব আসনে ভোটগ্রহণই হয়নি। কেবল বাকি ১৪৭টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সংখ্যার দিক থেকে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসনে ভোট না হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
দ্বাদশ নির্বাচনে একদিনে সব আসনে ভোট হয়নি
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সব ৩০০ আসনে একই দিনে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। বিরোধী দলের বড় অংশ নির্বাচন বয়কট করায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত ছিল। পাশাপাশি অন্তত একটি আসনে প্রশাসনিক ও পরিস্থিতিগত কারণে ভোট স্থগিত করা হয়।ফলে আইনগতভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও বাস্তবে একই দিনে ৩০০ আসনে ভোটগ্রহণ হয়নি।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে কমপক্ষে চারটি নির্বাচনে বাস্তবে ৩০০টি আসনের সবগুলোতে ভোটগ্রহণ হয়নি। এর প্রধান কারণগুলো হলো রাজনৈতিক বয়কট, একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন, প্রশাসনিক বা আইনগত কারণে ভোট স্থগিত।








