বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তত ১২৪ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং ৩০৮টি শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র উঠে এসেছে শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠন শিশুরাই সব–এর এক প্রতিবেদনে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং সারা বছরজুড়েই তা ঘটেছে।
শিশুহত্যা: বছরে ১২৪, মাসে গড়ে ১১
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১২৪ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১১টি করে শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
নিহত শিশুদের মধ্যে মেয়ে শিশু ৬৩ জন, ছেলে শিশু ৫৯ জন এবং লিঙ্গ অনির্ধারিত ২ জন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার। এ বয়সসীমায় নিহতের সংখ্যা ৬৪ জন, যা মোট ঘটনার প্রায় ৫১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি শিশুহত্যা ঘটেছে ৩৮টি। অন্যদিকে সিলেট ও বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম, প্রতিটিতে ৫টি করে ঘটনা ঘটেছে।
অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে পারিবারিক কলহ বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ঘরই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান
শিশুহত্যার ঘটনাগুলোর ৬৬ শতাংশের বেশি ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে, অর্থাৎ নিজের ঘর বা আত্মীয়ের বাসায়।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ, নির্জন স্থান বা মাঠে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, জলাশয়ে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রাস্তায় ৪ দশমিক ০৩ শতাংশ
অধিকাংশ অপরাধী পরিচিত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যাকারীরা শিশুর পরিচিত ব্যক্তি। এর মধ্যে মা-বাবা জড়িত ৩৮টি ঘটনা, নিকট আত্মীয় জড়িত ২৬টি ঘটনা, শিক্ষক বা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জড়িত ১৫টি ঘটনা এবং প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তি জড়িত ১৮টি ঘটনা। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিশুহত্যা পরিচিত মানুষের হাতেই ঘটেছে।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রধান কারণ
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিশুহত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল পারিবারিক সহিংসতা ও দ্বন্দ্ব, যা প্রায় ৩৭.৯ শতাংশ ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যৌন নির্যাতন, অপহরণ ও মুক্তিপণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন, মাদকাসক্তি। এসব কারণও বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি কম
১২৪টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মামলা হয়েছে ৩৫টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ২৯টি ঘটনায় এবং তদন্তাধীন রয়েছে ৩২টি ঘটনা। তবে মাত্র ২টি ঘটনায় সাজা হয়েছে।
যৌন নির্যাতনের শিকার ৩০৮ শিশু
২০২৫ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩০৮টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ১৯৭টি, ধর্ষণের চেষ্টা ৭৭টি, দলগত ধর্ষণ ২৪টি, ধর্ষণের পর হত্যা ১০টি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে ৯০টি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রামে ৫২টি, রাজশাহীতে ৩০টি, খুলনায় ২৭টি, সিলেটে ২৬টি, ময়মনসিংহে ২৩টি, বরিশালে ২০টি এবং রংপুরে ২০টি।
শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে তাদের নিজের বাড়ি। এছাড়া বড়দের পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে শিশুদের হত্যা করার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে ৩৮টি ঘটনায় বাবা-মা নিজ সন্তানকে হত্যা করেছে, যা সমাজে নতুন এক উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
করণীয় কী
প্রতিবেদনে শিশুদের সুরক্ষায় কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জাতীয় শিশু কমিশন প্রতিষ্ঠা, শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী শিশুদের স্বাস্থ্য, আইনি ও কাউন্সেলিং সহায়তা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের নিরাপত্তা ও সচেতনতা।
শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে সরকার, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।








